ত্রিশক্তির অক্ষ না কৌশলগত অভিনয়? তেহরান সংঘাতে বেইজিং–মস্কোর নীরব কৌশল।
সম্পাদকীয়:
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি প্রশ্ন জোরালো হয়েছে—তেহরানের ঘনিষ্ঠ বলয়ভুক্ত চীন ও রাশিয়া কার্যত নীরব কেন? তারা কি ইরানের পাশে নেই?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে দুটি কূটনৈতিক শব্দের পার্থক্য বুঝতে হবে: অংশীদার (partner) এবং মিত্র (ally)। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় এই দুটির আইনি ও কৌশলগত অর্থ এক নয়।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে দুটি কূটনৈতিক শব্দের পার্থক্য বুঝতে হবে: অংশীদার (partner) এবং মিত্র (ally)। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় এই দুটির আইনি ও কৌশলগত অর্থ এক নয়।
ইরানের সঙ্গে বেইজিং ও মস্কোর সম্পর্ক ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’; কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কার্যত মিত্রতার পর্যায়ে। এখানেই পার্থক্যের মূল।
অংশীদারিত্বের সীমা:
২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি ইরান ও রাশিয়া একটি ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু এতে যৌথ প্রতিরক্ষা বা বাধ্যতামূলক সামরিক হস্তক্ষেপের ধারা নেই। অর্থাৎ, ইরান আক্রান্ত হলে রাশিয়ার ওপর সরাসরি যুদ্ধে নামার কোনো আইনি দায় বর্তায় না। একইভাবে ২০২১ সালে ইরান ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিও মূলত অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতাকেন্দ্রিক।
চীনের কূটনৈতিক অভিধানে ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার’ মানে গভীর বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সমন্বয়—কিন্তু সামরিক জোট নয়। ফলে হামলার পর মস্কো ও বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ থেকেছে নিন্দা ও কূটনৈতিক বিবৃতিতে।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ সহানুভূতি জানিয়েছেন, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের সমালোচনা করেছেন। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিন্দা জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা আসেনি।
মিত্রতার দায়বদ্ধতা:
মিত্রতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ন্যাটো। এর আর্টিকেল-৫ অনুযায়ী, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্যরা তার পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কও কার্যত সেই পর্যায়ে—যদিও আনুষ্ঠানিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই।
মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ মর্যাদা দিয়েছে। ফলে তেল আবিবের নিরাপত্তা প্রশ্নে ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা অস্বাভাবিক নয়।
অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে চীন–রাশিয়ার সম্পর্ক কৌশলগত হলেও বাধ্যতামূলক সামরিক জোট নয়। ফলে তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কূটনৈতিক ঢাল দিতে পারে, ভেটো প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সরাসরি যুদ্ধে নামার দায় তাদের নেই।
অর্থনৈতিক হিসাব–নিকাশ:
বেইজিং ও মস্কোর সংযমের পেছনে বড় কারণ অর্থনীতি। চীন ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা; একই সঙ্গে রাশিয়াও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে। এমন প্রেক্ষাপটে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো মানে নতুন নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক বাজারে আরও বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানি ড্রোন প্রযুক্তির সুবিধাভোগী। কিন্তু সেটিও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা—যুদ্ধকালীন মিত্রতার প্রতিশ্রুতি নয়।
চীন ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত খেলায় একটি ঘুঁটি হিসেবে দেখে—মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা প্রভাব সীমিত করার হাতিয়ার হিসেবে। কিন্তু সেই খেলায় সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানো বেইজিংয়ের নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
প্রতীকী সমর্থন, বাস্তব সংযম:
চীন ও রাশিয়া নিজেদের ‘বহুমেরু বিশ্ব’ প্রতিষ্ঠার প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরলেও, মিত্রদেশের সংকটে তাদের প্রতিক্রিয়া বারবার প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ইরান প্রসঙ্গেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন একই মিত্রশক্তির অংশ ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তারা পরস্পরের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। সেই প্রেক্ষাপটে ‘বন্ধু’ শব্দটির অর্থও বদলে গেছে—এখন তা মূলত স্বার্থনির্ভর সমীকরণ।
উপসংহার:
ইরান–চীন–রাশিয়া সম্পর্কের বাস্তবতা হলো—এটি স্বার্থভিত্তিক অংশীদারিত্ব, সামরিক মিত্রতা নয়। বেইজিং ও মস্কোর লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা প্রভাব চ্যালেঞ্জ করা, কিন্তু ইরানের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো নয়।
অতএব, চীন ও রাশিয়ার ‘নীরবতা’ আদতে কৌশলগত হিসাব-নিকাশের বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্বের চেয়ে স্বার্থই বড়—এ সংকট আবারও সেই পুরোনো সত্যকে স্পষ্ট করে দিল।
অংশীদারিত্বের সীমা:
২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি ইরান ও রাশিয়া একটি ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু এতে যৌথ প্রতিরক্ষা বা বাধ্যতামূলক সামরিক হস্তক্ষেপের ধারা নেই। অর্থাৎ, ইরান আক্রান্ত হলে রাশিয়ার ওপর সরাসরি যুদ্ধে নামার কোনো আইনি দায় বর্তায় না। একইভাবে ২০২১ সালে ইরান ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিও মূলত অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতাকেন্দ্রিক।
চীনের কূটনৈতিক অভিধানে ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার’ মানে গভীর বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সমন্বয়—কিন্তু সামরিক জোট নয়। ফলে হামলার পর মস্কো ও বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ থেকেছে নিন্দা ও কূটনৈতিক বিবৃতিতে।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ সহানুভূতি জানিয়েছেন, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের সমালোচনা করেছেন। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিন্দা জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা আসেনি।
মিত্রতার দায়বদ্ধতা:
মিত্রতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ন্যাটো। এর আর্টিকেল-৫ অনুযায়ী, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্যরা তার পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কও কার্যত সেই পর্যায়ে—যদিও আনুষ্ঠানিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই।
মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ মর্যাদা দিয়েছে। ফলে তেল আবিবের নিরাপত্তা প্রশ্নে ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা অস্বাভাবিক নয়।
অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে চীন–রাশিয়ার সম্পর্ক কৌশলগত হলেও বাধ্যতামূলক সামরিক জোট নয়। ফলে তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কূটনৈতিক ঢাল দিতে পারে, ভেটো প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সরাসরি যুদ্ধে নামার দায় তাদের নেই।
অর্থনৈতিক হিসাব–নিকাশ:
বেইজিং ও মস্কোর সংযমের পেছনে বড় কারণ অর্থনীতি। চীন ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা; একই সঙ্গে রাশিয়াও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে। এমন প্রেক্ষাপটে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো মানে নতুন নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক বাজারে আরও বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানি ড্রোন প্রযুক্তির সুবিধাভোগী। কিন্তু সেটিও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা—যুদ্ধকালীন মিত্রতার প্রতিশ্রুতি নয়।
চীন ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত খেলায় একটি ঘুঁটি হিসেবে দেখে—মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা প্রভাব সীমিত করার হাতিয়ার হিসেবে। কিন্তু সেই খেলায় সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানো বেইজিংয়ের নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
প্রতীকী সমর্থন, বাস্তব সংযম:
চীন ও রাশিয়া নিজেদের ‘বহুমেরু বিশ্ব’ প্রতিষ্ঠার প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরলেও, মিত্রদেশের সংকটে তাদের প্রতিক্রিয়া বারবার প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ইরান প্রসঙ্গেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন একই মিত্রশক্তির অংশ ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তারা পরস্পরের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। সেই প্রেক্ষাপটে ‘বন্ধু’ শব্দটির অর্থও বদলে গেছে—এখন তা মূলত স্বার্থনির্ভর সমীকরণ।
উপসংহার:
ইরান–চীন–রাশিয়া সম্পর্কের বাস্তবতা হলো—এটি স্বার্থভিত্তিক অংশীদারিত্ব, সামরিক মিত্রতা নয়। বেইজিং ও মস্কোর লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা প্রভাব চ্যালেঞ্জ করা, কিন্তু ইরানের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো নয়।
অতএব, চীন ও রাশিয়ার ‘নীরবতা’ আদতে কৌশলগত হিসাব-নিকাশের বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্বের চেয়ে স্বার্থই বড়—এ সংকট আবারও সেই পুরোনো সত্যকে স্পষ্ট করে দিল।
এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন