সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

শবে মেরাজ: অলৌকিক সফর, ইমানের পরীক্ষা ও উম্মতের জন্য শিক্ষা।

সম্পাদকীয়:

ইসলামের ইতিহাসে শবে মেরাজ এক অনন্য ও বিস্ময়কর রাত। এটি শুধু রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর জীবনের একটি অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য ঈমান, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির এক গভীর বার্তা বহন করে।

মেরাজের ঘটনা: মক্কা থেকে সিদরাতুল মুনতাহা

হিজরতের প্রায় এক বছর আগে, রজব মাসের ২৭ তারিখে (মতভেদ রয়েছে), আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ ﷺ–কে এক রাতে মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) এবং সেখান থেকে সপ্তম আকাশ পেরিয়ে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত নিয়ে যান। এই সফরের প্রথম অংশকে বলা হয় ইসরা, আর দ্বিতীয় অংশকে বলা হয় মেরাজ

কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইসরা সম্পর্কে বলেন—

“পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে গিয়েছিলেন—যার চারপাশে আমি বরকত দান করেছি—তাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখানোর জন্য।”
(সুরা আল-ইসরা: ১)

হাদিসে এসেছে, জিবরাইল (আ.) রাসুল ﷺ–কে বোরাক নামক বাহনে করে প্রথমে বাইতুল মুকাদ্দাসে নিয়ে যান। সেখানে তিনি আগের নবীদের ইমাম হিসেবে নামাজ আদায় করেন। এরপর শুরু হয় আসমানভ্রমণ।

আসমানে নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ

সহিহ হাদিস অনুযায়ী, মেরাজের পথে রাসুল ﷺ একে একে বিভিন্ন আসমানে নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন—

  • প্রথম আসমানে হজরত আদম (আ.)

  • দ্বিতীয় আসমানে হজরত ঈসা (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.)

  • তৃতীয় আসমানে হজরত ইউসুফ (আ.)

  • চতুর্থ আসমানে হজরত ইদরিস (আ.)

  • পঞ্চম আসমানে হজরত হারুন (আ.)

  • ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.)

  • সপ্তম আসমানে হজরত ইব্রাহিম (আ.)

এরপর রাসুল ﷺ পৌঁছান সিদরাতুল মুনতাহা—সৃষ্টিজগতের শেষ সীমানায়, যেখানে জিবরাইল (আ.)–এরও অগ্রসর হওয়ার অনুমতি ছিল না।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ: উম্মতের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার

মেরাজের রাতে আল্লাহ তাআলা রাসুল ﷺ–এর মাধ্যমে উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ নির্ধারণ করেন। প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলেও, হজরত মুসা (আ.)–এর পরামর্শে রাসুল ﷺ বারবার আল্লাহর দরবারে ফিরে যান এবং শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে তা সীমাবদ্ধ হয়—কিন্তু সওয়াব রাখা হয় ৫০ ওয়াক্তের সমান।

রাসুল ﷺ বলেছেন—

“পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়েছে, কিন্তু এগুলোর প্রতিদান পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান।”
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এ কারণে নামাজকে বলা হয় মুমিনের মেরাজ—যার মাধ্যমে একজন বান্দা প্রতিদিন আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।

শবে মেরাজের শিক্ষা ও তাৎপর্য

শবে মেরাজ মুসলমানদের জন্য কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা রেখে গেছে—

  1. নামাজের গুরুত্ব: ইসলামের অন্য সব বিধান জমিনে নাজিল হলেও নামাজ সরাসরি আসমানে ফরজ করা হয়েছে, যা এর বিশেষ মর্যাদা নির্দেশ করে।

  2. আল্লাহর কুদরত ও ক্ষমতার ওপর ঈমান: মেরাজ ছিল ঈমানের এক বড় পরীক্ষা। যারা নিখাদ মুমিন, তারা বিনা প্রশ্নে এ ঘটনায় বিশ্বাস স্থাপন করেছেন।

  3. রাসুল ﷺ–এর মর্যাদা: মেরাজ প্রমাণ করে, আল্লাহর কাছে রাসুল ﷺ–এর অবস্থান কতটা উচ্চ।

  4. ধৈর্য ও পরীক্ষার পর পুরস্কার: তায়েফের কষ্ট, খাদিজা (রা.) ও আবু তালিবের ইন্তেকালের পর এই সম্মান আল্লাহর পক্ষ থেকে সান্ত্বনা ছিল।

উপসংহার

শবে মেরাজ কেবল স্মরণ করার বিষয় নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান। নামাজে অবহেলা, ঈমানের দুর্বলতা ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে ফিরে এসে এই রাত আমাদের আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার সুযোগ করে দেয়।

মেরাজের মূল শিক্ষা হলো—যে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, আল্লাহ তাকে তাঁর নৈকট্যের পথে তুলে নেন।


সম্পাদকের কথা

পবিত্র শবে মেরাজ আমাদের সামনে আত্মশুদ্ধি, সংযম ও নৈতিক জাগরণের এক গভীর বার্তা নিয়ে আসে। এই মহিমান্বিত রাত স্মরণ করিয়ে দেয়—ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ন্যায়, সততা ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের সম্মিলিত কর্তব্য।

এই সময়ে দেশবাসীর প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান—ধর্মীয় অনুভূতিকে যেন কোনোভাবেই বিভাজন, বিদ্বেষ কিংবা অসহিষ্ণুতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা হয়। শবে মেরাজের শিক্ষা আমাদের শেখায় আত্মসংযম, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে।

আমরা আশা করি, এই পবিত্র উপলক্ষ্যে সবাই নামাজে মনোযোগী হবেন, অসৎ পথ পরিহার করবেন এবং সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। ব্যক্তি জীবনের সংশোধনের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই শবে মেরাজের প্রকৃত শিক্ষা বাস্তব রূপ পায়।

দেশ আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই সংকটময় সময়ে প্রয়োজন ঐক্য, ধৈর্য ও নৈতিক দৃঢ়তা। ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা যদি আমরা দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত করতে পারি, তবেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

শবে মেরাজ হোক আত্মসমালোচনা ও আলোকিত পথে ফিরে আসার উপলক্ষ—এই প্রত্যাশায় দেশবাসীর প্রতি আমাদের আন্তরিক শুভকামনা।


এম সুজন হোসাইন 
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন