সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

সততার রাজনীতি কি এই দেশে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ?

সম্পাদকীয়:

জনগণের ভাষায় কথা বললেই কি গুলির নিশানা ঠিক হয়ে যায়? ক্ষমতার মুখোশ খুলে দেখালেই কি একজন মানুষকে বাঁচতে দেওয়া হয় না? হাদী কোনো কিংবদন্তি ছিল না—হাদী ছিল প্রশ্ন। আর এই রাষ্ট্র প্রশ্নকে ভয় পায়।
হাদী চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিল অস্ত্রের নয়, জনতার শক্তির।
সে বলেছিল—কু করতে চাইলে করো, কিন্তু মনে রেখো, ক্যান্টনমেন্টের দেয়াল ইট দিয়ে গড়া, আর ইট জনগণের হাতেই থাকে। এটা হুমকি ছিল না—এটা ছিল ইতিহাসের বাস্তবতা।
হাদী চোখে চোখ রেখে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছিল। ভদ্রতার মেকি ভাষায় নয়—সোজাসাপটা সত্যে। কারা কাজ করতে দিচ্ছে না—নাম বলার সাহস চেয়েছিল সে। কারণ হাদী জানত, গণতন্ত্র ভয়ে বাঁচে না, সত্যে বাঁচে।
ইন্টেরিমের উপদেষ্টাদের সে মনে করিয়ে দিয়েছিল— জুলাই কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি না, কোনো দলের ব্র্যান্ড না। জুলাই শহীদদের রক্তে লেখা ইতিহাস। আর সেই ইতিহাস বেচাকেনা করলে জনগণ একদিন হিসাব নেবেই।
হাদী বিএনপিকে বলেছিল—স্বাধীনতার দলকে দাসত্বে নামিও না।
জামায়াতকে বলেছিল—আদর্শের বুলি দিয়ে পরাধীনতা ঢেকে রাখা ভণ্ডামি।
এনসিপিকে বলেছিল—জুলাই তোমাদের উত্তরাধিকার নয়, এটা জাতির চেতনা।
এমনকি প্রতিপক্ষের প্রতিও সে বলেছিল—যারা অপরাধী নয়, তাদের সঙ্গেও ইনসাফ হবে।
কারণ হাদীর রাজনীতি ছিল প্রতিশোধের নয়—ন্যায়ের। এই দেশে যেখানে রাজনীতি মানে শত্রু বানানো, সেখানে হাদী প্রতিদ্বন্দ্বীকেও “ভাই” বলেছিল। সে দেখাতে চেয়েছিল—রাজনীতি মানেই মানবতা হারানো না। হাদী ভাঙতে চেয়েছিল “হেভিওয়েট রাজনীতি”র মিথ। সে প্রমাণ করতে চেয়েছিল— কোটি টাকার দেয়াল টপকাতে লাগে না কোটি টাকা, লাগে সততা, ত্যাগ আর জনগণের ভাষা বোঝার সাহস। সে চেয়েছিল সংখ্যালঘুদের জন্য মর্যাদার রাজনীতি— ভোটব্যাংক নয়, নাগরিক অধিকার।
সে স্বপ্ন দেখেছিল— বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে জাতির ঐক্য, কালচারাল ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে যোগ্য নেতৃত্ব।
সে চেয়েছিল বিচার— জুলাইয়ের শহীদদের, বিডিআরের,শাপলার, গুম-খুনের শিকার প্রতিটি নামহীন মানুষের।
এগুলো কি অপরাধ? এগুলো কি রাষ্ট্রবিরোধিতা? নাকি এগুলোই আসলে একটি রাষ্ট্রের ন্যূনতম নৈতিক দায়? আজ প্রশ্ন একটাই— এই দেশে কি সততা নিয়ে রাজনীতি করা নিষিদ্ধ? ইনসাফের কথা বললেই কি মৃত্যু অনিবার্য?
জনগণের পাশে দাঁড়ালেই কি জীবনের দাম দিতে হয়? যদি হাদীর স্বপ্ন অপরাধ হয়— তাহলে এই রাষ্ট্রকেই নিজের দিকে তাকাতে হবে। আর যদি হাদীর চাওয়াগুলো সত্য হয়— তাহলে হাদী মরেনি।

হাদী আজও বেঁচে আছে—
একটা প্রশ্ন হয়ে, একটা অস্বস্তি হয়ে, এই জাতির বিবেকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে। কারণ মানুষ মরে, কিন্তু প্রশ্ন—কখনো মরে না।

এম সুজন হোসাইন 
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন