সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, এটি কখনো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়।

সম্পাদকীয়:

দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে তীব্র নাড়া দেওয়া বাউল আবুল সরকারের প্রকাশ্য অবমাননাকর বক্তব্য শুধু বিতর্ক নয়—এটি সামাজিক শান্তি, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং আইনশৃঙ্খলার ওপর সরাসরি আঘাত। আল্লাহ ও ধর্মীয় পবিত্রতা নিয়ে এমন বেপরোয়া, দায়িত্বহীন ও উস্কানিমূলক মন্তব্য যে সামগ্রিকভাবে দেশবাসীকে ব্যথিত করবে, তা অনুমান করতেই পারার কথা ছিল।
ফলে তার গ্রেপ্তারকে জনগণ স্বস্তির পদক্ষেপ হিসেবেই দেখেছে। আইনের শাসন রক্ষার জন্য এটি ছিল সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
কিন্তু এখানেই থেমে নেই অস্থিরতার চক্রান্ত। বরং, ঘটনা ঘোলাটে করার চেষ্টা এখন আরও স্পষ্ট। আবুল সরকারের পক্ষাবলম্বী একটি গোষ্ঠী মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনাকর আচরণের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে উসকে দিতে চাইছে—যেন অপরাধীর দায় জনগণের প্রতিবাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায়। এটি শুধু রাজনৈতিক অসততা নয়; এটি একটি পরিকল্পিত সামাজিক প্রকল্প, যা ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক তকমা দিয়ে দুর্বল করার অপচেষ্টা।
তারও বেশি উদ্বেগজনক হলো—দেশের কিছু রাজনৈতিক দল, বিশেষত একটি প্রধান দল ও তাদের ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী মহল প্রকাশ্যে আল্লাহকে অবমাননাকারী বক্তব্যের নিন্দা না করে উল্টো শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী সাধারণ মানুষকে “উগ্রবাদী” হিসেবে আখ্যায়িত করছে। এটি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের একটি ভয়ংকর রূপ। ধর্মীয় অবমাননা নিয়ে নীরবতা আর প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে কটুক্তি—দুই মিলে এটি এক বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি করছে: অপরাধীর পক্ষ নেওয়া, আর বিশ্বাসীদের ন্যায়সংগত প্রতিবাদকে অপরাধ বানানো।
এই ভুল ধারাটি সমাজকে বিভাজিত করে, উস্কানি বাড়ায় এবং যারা ধর্মবিরোধী বক্তব্য ছড়াতে চায় তাদের আরও সাহসী করে তোলে।
এটি বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়—ধর্মকে অপমান করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়; সমাজকে অস্থিতিশীল করার একটি অপরাধমূলক কাজ। আবার একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার—প্রতিবাদের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন নাশকতা, সহিংসতা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি না করতে পারে।
কিন্তু এখানে যে দৃশ্যটি দেখা গেছে, তা সম্পূর্ণ উল্টো: অপরাধী বক্তব্যদাতাকে ঢাকার চেষ্টা চলছে; আর সংবেদনশীল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে উগ্রতার তকমা পরানো হচ্ছে।
এটি রাজনৈতিক কৌশল হোক বা মতাদর্শিক জেদ—ফল একই: সমাজে বিভেদ, রাষ্ট্রে অস্থিরতা।
রাষ্ট্র যদি ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নেয়, তবে এই ধরনের অপরাধ আরও বাড়বে। তাই সরকারের উচিত—
আবুল সরকারের বিরুদ্ধে দ্রুত, স্বচ্ছ, দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা
ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক বয়ানে বিকৃত করার প্রবণতা রোধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উসকানিদাতা ও বিশৃঙ্খলাকারীদের প্রতি সমানভাবে কঠোর হতে বলা
রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বহীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়া
ধর্মের প্রতি অবমাননা বরদাশত না করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রতিবাদকে প্ররোচনার অস্ত্র বানানোর প্রবণতাও কঠোরভাবে থামাতে হবে।
বাংলাদেশের শত বছরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সামাজিক সম্প্রীতি কখনোই এই ধরনের বক্তব্য বা এর পক্ষে দাঁড়ানো গোষ্ঠীকে সমর্থন করে না। অপরাধীকে রক্ষা ও প্রতিবাদকারীর ওপর দোষ চাপানো—এটি অতীতের অগণতান্ত্রিক চরিত্রেরই পুনরাবৃত্তি।
এই মুহূর্তে জাতি রাজনীতির কুয়াশার নয়; আইনের স্পষ্ট আলো দেখতে চায়।
ধর্মীয় অবমাননা যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি শান্ত জনগণকে উগ্রবাদী বলে অপমান করাও সমানভাবে নিন্দনীয়। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে— আইনই শেষ কথা। ন্যায়ই শেষ সিদ্ধান্ত।

এম সুজন হোসাইন 
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন