সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

রাজনৈতিক পালাবদলের পর অটোরিকশার উত্থান: রাজধানীর সড়কে কেন শাসনের অভাব?

সম্পাদকীয়:

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আজ এক গভীর পরিবহন সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অটোরিকশার সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, তা নিছক যানবাহন বৃদ্ধির স্বাভাবিক প্রবণতা নয়—এটি রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা এবং পরিকল্পনাহীন নগর শাসনের একটি প্রতিকী চিহ্ন।
বিশ্বের অন্যতম জনবহুল রাজধানীগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় যে ধরনের নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে, তা দেশের ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
একটি দেশের রাজধানী শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়—এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও দূরদৃষ্টির প্রতিচ্ছবি। কিন্তু ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি সেই মানদণ্ড থেকে বহু দূরে সরে গেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনুন্নত রাজধানীগুলোর দৃষ্টান্ত টেনে তুললেও দেখা যায়, তারা পর্যন্ত এমন নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা ও তিনচাকার ভিড়কে শহরের মূল সড়কে অবাধে চলতে দেয় না। বাংলাদেশ—যে দেশ তার উন্নয়ন অর্জনকে বিশ্বে তুলে ধরতে চায়—তার রাজধানীতে এই অব্যবস্থাপনা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ব্যর্থতারই ইঙ্গিত বহন করে।
অনেকের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই অটোরিকশার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এটি নিছক কাকতালীয় বৃদ্ধি কি না, নাকি এর আড়ালে প্রশাসনিক উদাসীনতা, রাজনৈতিক সুযোগসন্ধান বা নগর ব্যবস্থাপনার নীতিগত ভাঙন—সেই প্রশ্ন আজ নাগরিক মহলে তীব্রতর। রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলে যেভাবে হঠাৎ করে অটোরিকশার বিস্তার ঘটেছে, তা পরিকল্পনার অভাবের পাশাপাশি গভীরতর রাজনৈতিক নীরবতারও ইঙ্গিত দেয়।
অটোরিকশা চালকদের মধ্যে শৃঙ্খলা, ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার অভাব বহুদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। কিন্তু সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু কেবল চালকের আচরণ নয়—বরং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কার্যকর মনিটরিং, নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ, রুট পরিকল্পনা এবং আইন প্রয়োগের ঘাটতি। দামি গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ, ট্রাফিক আইন ভাঙা, জবাবদিহিহীন আচরণ—এসবই একটি বড়তর বাস্তবতার লক্ষণ—রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ শৃঙ্খলার অনুপস্থিতি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও প্রশাসন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ। কোথাও সুনির্দিষ্ট অভিযান নেই, কোথাও নিবন্ধন যাচাই নেই, কোথাও রুট নিয়ন্ত্রণ নেই—ফলে রাজধানীর সড়কগুলো নিয়ন্ত্রণহীন তিনচাকার দখলে চলে যাচ্ছে। কেন এই ব্যর্থতা? এটি কি প্রশাসনের অক্ষমতা, নাকি রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ভুল হিসাব? এই প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করা এখন আর সম্ভব নয়।
রাষ্ট্র যখন নিজের রাজধানীতেই শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন তা আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তিকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরে। বাংলাদেশ যে নিজেকে একটি উদীয়মান অর্থনীতি, একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র, একটি সুশাসনের উদাহরণ হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করতে চায়—ঢাকার বর্তমান পরিবহন নৈরাজ্য সেই আকাঙ্ক্ষাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
সমাধান: আধুনিক রাজধানীর দাবি কঠোরতা, পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ঢাকার বর্তমান অবস্থায় পরিষ্কার সমাধান আছে, কিন্তু প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ১) প্রধান সড়কগুলো থেকে অটোরিকশাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা এবং ২) নির্দিষ্ট উপসড়ক/ফিডার রুটে সীমাবদ্ধ রাখা—এটি এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। ৩) নিবন্ধন যাচাই, রুটপারমিট সংস্কার, ডিজিটাল মনিটরিং—এই তিনটি পদক্ষেপ ছাড়া রাজধানীকে সুশৃঙ্খল করা অসম্ভব। ৪) রাজনৈতিক দলগুলোকে পরিবহন ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক সুবিধা বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে।
ঢাকা এমন একটি শহর নয়, যার নৈরাজ্যকে “স্বাভাবিক” বলা যায়। এই রাজধানী আমাদের জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। তাই এটি বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর, দূরদর্শী ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে—নইলে বিশ্বমঞ্চে দেশের অবস্থান আরও সংকুচিত হতে বাধ্য।


এম সুজন হোসাইন 
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন