সত্য বলার মূল্য ও সাংবাদিকের নিঃসঙ্গ জীবন।
সম্পাদকীয়:
নিঃসঙ্গ সাংবাদিকের আর্তনাদ
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে আবারও এক বেদনাদায়ক অধ্যায় যুক্ত হলো। সিনিয়র সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার—একজন মানুষ, যিনি কলমকে হাতিয়ার করে সত্য উচ্চারণ করেছেন, অথচ নিজের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রেখে গেলেন হতাশা, নিঃসঙ্গতা আর আত্মদহন।
বিভুরঞ্জন সরকারের শেষ লেখা যেন এক দীর্ঘশ্বাস—
“আমার জীবনে কোনো সাফল্যের গল্প নেই… দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী।”
এই অক্ষরগুলো শুধু একটি মানুষের অন্তরের হাহাকার নয়, বরং এক পুরো পেশার নীরব কান্না। সত্য বলার শপথ নেওয়া সাংবাদিকদের জীবনে যে কতটা নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও বঞ্চনা জমা হয়, সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে তার আত্মকথনে।
সাংবাদিক মানে হলো অন্যের জন্য নিরন্তর ছুটে চলা। কারও কষ্টের কথা তুলে ধরা, কারও অধিকার ফেরানোর লড়াই করা, কারও দুর্দশা প্রকাশ করা—এটাই তার নিত্যদিনের কাজ। কিন্তু এই দৌড়ঝাঁপের মাঝেই কোথাও যেন নিজের জন্য থাকে না কোনো সময়। পরিবারকে দেওয়া হয় না যথেষ্ট যত্ন, সমাজও ফিরিয়ে দেয় না প্রাপ্য সম্মান। যাদের জন্য কাজ করেন, তাদের কাছেও থাকেন প্রায় অচেনা। শেষে সাংবাদিক হয়ে ওঠেন একা, ক্লান্ত, নিস্তেজ ও নিঃসঙ্গ।
বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দিল, সাংবাদিকতা শুধু এক ঝলমলে পেশা নয়— এটি এক দহনভরা সংগ্রামের নাম। সত্য বলার সাহসী কণ্ঠস্বরকে প্রায়ই মূল্য দিতে হয় চাকরি হারিয়ে, সামাজিক অবজ্ঞা সয়ে কিংবা নিজের বিশ্বাস ভেঙে। যারা আপস করতে চায় না, তাদের পরিণতি প্রায়শই নিঃসঙ্গতায় গিয়ে ঠেকে।
আজ প্রশ্ন জাগে—আমরা কি কখনো সাংবাদিকদের জন্য ভেবেছি? তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য, তাদের নিরাপত্তার জন্য, তাদের সম্মানের জন্য? তারা আমাদের জন্য দিনরাত সংগ্রাম করেন, অথচ দিনশেষে থেকে যান একা। সমাজের কাছে তারা প্রায়শই অবহেলিত। আর সেই অবহেলার যন্ত্রণা অনেক সময় চেপে বসে প্রাণঘাতীভাবে।
বিভুরঞ্জন সরকারের চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা—যদি সাংবাদিকদের মর্যাদা, সুরক্ষা ও ভালোবাসা নিশ্চিত না করি, তবে সত্যের এই সৈনিকেরা একে একে নিভে যাবেন।
হয়তো ওপারে তিনি একটু শান্তি পাবেন, যেখানে সত্য বলা নিষিদ্ধ নয়, অবহেলা নেই, নেই নিঃসঙ্গতা। কিন্তু আমরা যারা এখানে রয়ে গেলাম, তাদের কর্তব্য হলো—এই সমাজে যারা কলম ধরে সত্য বলে, তাদের পাশে দাঁড়ানো।
কারণ সংবাদকর্মী যদি বারবার নিঃসঙ্গ, অবহেলিত আর ভগ্নস্বপ্নের মানুষে পরিণত হন, তবে গণমাধ্যম হারাবে তার আসল শক্তি—সত্যের নির্ভীক কণ্ঠস্বর।
বিভুরঞ্জন সরকারের অকাল মৃত্যু আমাদের সামনে আয়নার মতো দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এই পেশার কঠিন বাস্তবতা। হয়তো ওপারে তিনি শান্তি পাবেন। কিন্তু আমাদের এই সমাজ যদি সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম সহানুভূতি, সম্মান ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে, তবে আরও কতজন বিভুরঞ্জন সরকার এভাবেই হারিয়ে যাবেন—তা কে জানে?
এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন