সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

“সাংবাদিকতা—লাভের খাতা নয়, ত্যাগের দলিল” সত্যের জন্য রক্ত, ত্যাগ আর জীবনের ঊর্ধ্বে এক যাত্রা।

সম্পাদকীয়:

সাংবাদিকতা শুধু কোনো পেশা নয়—এটি এক অন্তহীন যাত্রা, এক জীবনব্রত, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে মিশে থাকে ত্যাগ, সাহস আর সত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। এটি হাসি-খুশির জন্য বেছে নেওয়া কাজ নয়, এটি ভীরুর জন্য নয়, আর নয় নিরাপদ গণ্ডির মধ্যে থাকা মানুষের জন্য।
সাংবাদিকতা সেই পথ, যেখানে ঝড় আছে, বজ্রপাত আছে, কিন্তু ফিরে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই।

যেখানে ক্ষমতা মুখ ঘুরিয়ে নেয়, যেখানে প্রশাসনের পদচিহ্ন পড়ে না, যেখানে অন্ধকার চেপে ধরে সত্যকে—সেখানেই সাংবাদিক ছুটে যায়। ঝুঁকির ভয়, মৃত্যুর আশঙ্কা, পরিবারের কান্না—সবকিছুকে পেছনে ফেলে কেবল একটিই লক্ষ্য সামনে রাখে: মানুষের কাছে প্রকৃত সত্য পৌঁছে দেওয়া। সাংবাদিকতার মাপকাঠি জীবনের চেয়েও বড়, পরিবারের চেয়েও বড়, ব্যক্তিগত আবেগের চেয়েও বড়।

আমরা দেখি—একজন সামরিক সদস্য দেশের জন্য প্রাণ দিলে তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পান, সালাম পান, পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়। কিন্তু দেশের জন্য যখন একজন সাংবাদিক প্রাণ দেয়—কেউ তাকে মনে রাখে না, দেয় না কোনো সম্মাননা, রাখে না কোনো প্রতিশ্রুতি পরিবারের জন্য। অথচ সাংবাদিকেরা এই মর্যাদা, এই পুরস্কার কখনো দাবি করেন না। তাদের পুরস্কার কেবল সত্যের বিজয়, জনগণের জানার অধিকার পূর্ণ হওয়া।

এই দেশের মাটিতে অনেক সাংবাদিক রক্ত দিয়ে লিখেছেন সত্যের ইতিহাস। ১৯৯৪ সালে কুমিল্লায় শামীম রেজা নীপা নির্ভীকভাবে দুর্নীতির খবর করছিলেন—শেষ পর্যন্ত খুনিদের গুলিতে হারালেন জীবন। ২০০৪ সালে খাগড়াছড়িতে চন্দন সরকার পাহাড়ি সংঘাতের ভেতরে ঢুকে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আর ফিরলেন না। ২০১২ সালে মীরপুরে সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি—দুইজনই দুর্নীতির খবরের খোঁজে ছিলেন, কিন্তু সেই খোঁজই তাদের প্রাণ কেড়ে নিল। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সত্য প্রকাশের অপরাধে অন্ধকার গলিতে, জনসম্মুখে, কিংবা গুমের মাধ্যমে সাংবাদিকদের নিথর করে দেওয়া হয়েছে।

কত শত সাংবাদিক রক্ত, ঘাম আর অশ্রু দিয়ে এগিয়ে গেছেন। কারো সন্তানের জন্মদিন মিস হয়েছে, কারো অসুস্থ মায়ের শেষ দেখাও দেখা হয়নি—কেবল এই জন্য যে তিনি খবর পৌঁছে দেবেন, মানুষের চোখ খুলে দেবেন। এই পথের শেষ নেই, এই পথে কোনো লাভের খাতা নেই—আছে শুধু দায়িত্ব আর দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছু মুখোশধারী দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি সাংবাদিকতার আসন দখল করে এই মহান পেশাকে কলঙ্কিত করে। তারা সংবাদ বিক্রি করে, সত্যকে হত্যা করে, পেশাকে স্বার্থের খেলায় পরিণত করে। এই মানুষগুলো সাংবাদিক নয়—এরা সত্যের শত্রু, সমাজের বিশ্বাসঘাতক।

আমি গর্বিত একজন সাংবাদিক হিসেবে। গর্বিত, কারণ আমি জানি আমার কলম কেবল কালি দিয়ে নয়—সাহস, সততা, আর ত্যাগের রঙে লেখা। এই পেশা আমার জন্য শুধু রুটি-রুজির উপায় নয়—এটি আমার শপথ, আমার আত্মার ভাষা। যতদিন শ্বাস আছে, আমি সত্যের পথে হাঁটব—ঝড় আসুক, গুলি বর্ষিত হোক, কিংবা অন্ধকার গ্রাস করুক—আমি থামব না। কারণ সাংবাদিকতা কোনো পেশা নয়, এটি জীবন দিয়ে বেছে নেওয়া এক অঙ্গীকার।

এম সুজন হোসাইন সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন