গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিনের হত্যাকাণ্ড—সাংবাদিকতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশ।
সম্পাদকীয়:
গাজীপুর মহানগরের ব্যস্ততম এলাকা চান্দনা চৌরাস্তার কেন্দ্রস্থলে প্রকাশ্য দিবালোকে সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে যেভাবে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে, তা কেবল একটি ব্যক্তিকে হত্যা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, সাংবাদিকতা পেশার স্বাধীনতা এবং নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। তুহিন ছিলেন একজন দায়িত্ববান ও সক্রিয় সংবাদকর্মী, যিনি পেশাগত নিষ্ঠা থেকে বাস্তব ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন।
এই ভিডিও ধারণ করাই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ যেন সত্য ধারণের মূল্য হিসেবে জীবন উৎসর্গের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
এই ঘটনা শুধু গাজীপুর নয়, বরং গোটা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দেশের অন্যতম শিল্পনগরী গাজীপুরে জনাকীর্ণ এলাকায় যদি এমন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং হত্যাকারীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পারে—তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর, তা সহজেই অনুমেয়। হত্যাকাণ্ড সংঘটনের আগে একটি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল, যা সাংবাদিক তুহিন মোবাইলে ধারণ করেন। দুর্বৃত্তরা ভিডিও ডিলিট করতে বললেও তিনি সাহসিকতা দেখিয়ে অস্বীকৃতি জানান। এরই পরিণতিতে তিনি নির্মমভাবে প্রাণ হারান।
দেশে বারবার সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটছে, অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচার হয়নি বা বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে থেকেছে। এর ফলে সন্ত্রাসীরা উৎসাহিত হচ্ছে, আর সাংবাদিকরা নিরুৎসাহিত। এভাবে চলতে থাকলে সমাজ থেকে সাহসী ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বিলুপ্ত হবে, আর সত্য গুম হয়ে যাবে ভয়ের ছায়ায়।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা না থাকলে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে গণতন্ত্র রুগ্ন হয়ে পড়ে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে হারে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে, তা গণমাধ্যমের জন্য অশনিসংকেত। গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে, যেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে পুলিশের উপস্থিতি ও পর্যবেক্ষণ আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল।
এই নির্মম ঘটনার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। শুধু পুলিশি তদন্ত নয়, প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এটি একদিনের খবর নয়—এই হত্যাকাণ্ডের সামাজিক, আইনি ও নৈতিক দিক বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকেও সচেতনতা এবং সোচ্চার ভূমিকা প্রয়োজন। যেকোনো সহিংসতা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ভয়ে মুখ বুজে থাকা নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। সাংবাদিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তুহিন হত্যার বিচার আদায়ের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সংবাদকর্মীকে এমন নির্মম মৃত্যুবরণ করতে না হয়।
আমরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই, নিহত সাংবাদিক তুহিনের আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তাঁর পরিবারকে সহানুভূতি জানাই। একইসাথে জোর দাবি জানাই—এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সকল অপরাধীকে দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হোক। অন্যথায় এমন ঘটনা শুধু সাংবাদিকতাই নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের মৌলিক স্তম্ভগুলোকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।
এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন