একটি প্রতিরোধের গৌরবগাথা: ২০২৪ সালের সেই ৩৬ জুলাই।
সম্পাদকীয়:
লাইভ নিউজ-এর পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানো হচ্ছে সেইসব শহীদ, আহত এবং সংগ্রামী মানুষদের, যারা ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদের পতন করে গণতন্ত্রকে পুনর্জীবন দিয়েছেন।
ইতিহাসের পৃষ্ঠায় কিছু মুহূর্ত থাকে, যা এক জাতির আত্মপরিচয় নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে।
শুরুটা হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে, নিছক এক ন্যায্যতার আকাঙ্ক্ষা থেকে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররা জড়ো হয়েছিল নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি নিরপেক্ষ ও যুক্তিসংগত দাবি নিয়ে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই দাবি পরিণত হয় একটি বৃহত্তর আন্দোলনে—একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে জাতির সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে এই লড়াই। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র শাসন, দুর্নীতি, দমন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় ধারাবাহিক হস্তক্ষেপ—সবকিছুর বিরুদ্ধে যেন এই এক আন্দোলন হয়ে ওঠে এক দফার: “সরকারের পদত্যাগ চাই।”
তখনো কেউ জানত না—এই ছাত্র-আন্দোলন ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
ঢাকা থেকে রাজশাহী, চট্টগ্রাম থেকে রংপুর, সিলেট থেকে খুলনা—দেশজুড়ে গর্জে ওঠে বিক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর। আর আন্দোলনের উত্তরে সরকার যা দিল, তা ছিল বুলেট আর বুটের তাড়া। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশি গুলি, চোখের সামনে বন্ধুর লাশ, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে যাওয়া—এই নিষ্ঠুরতা যেন জনতার কণ্ঠরোধ নয়, বরং তাকে আরও উচ্চকণ্ঠ করে তোলে।
৪ আগস্ট আসে সেই সিদ্ধান্ত—“মার্চ টু ঢাকা” হবে ৫ তারিখেই। সরকারের দমননীতি তখনও চলছে; ইন্টারনেট বন্ধ, মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন, কিন্তু কিছুই থামাতে পারেনি সেই গণজোয়ারকে। ৫ আগস্ট সকাল হতেই রাজধানীর রাস্তায় নামে লক্ষ জনতা—শুধু ছাত্র নয়, পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক, মা-বাবা, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী—সবার মুখে একই ধ্বনি: “স্বৈরাচার নিপাত যাক।”
এদিন দুপুরে ঘটে যায় সেই ঐতিহাসিক ঘটনা—বাংলাদেশের ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে নিরব অভ্যন্তরীণ সঙ্কেত পেয়ে সেনাবাহিনীর একটি অংশ আর সরকারপন্থী অবস্থানে থাকতে অস্বীকৃতি জানায়। দুপুর ১টার দিকে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, একটি সামরিক উড়োজাহাজে করে তিনি ভারতের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে জাতি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে—দীর্ঘ পনেরো বছরের এক দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটে।
এই দিনটি কেবল একটি সরকারের পতন নয়—এটি ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নবজন্ম। এক প্রজন্মের রক্ত, সাহস, ত্যাগ আর ভালোবাসা মিশে যে বিজয়ের ইতিহাস গড়া হয়, সেটাই ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।
আজ, এক বছরের মাথায় দাঁড়িয়ে আমরা স্মরণ করি সেইসব শহীদ শিক্ষার্থী, যারা বুক পেতে দিয়েছিল রাষ্ট্রীয় বুলেটের সামনে। আমরা স্মরণ করি সেই মায়েদের, যারা সন্তানের লাশ দাফন করে বলেছিলেন—“আমার ছেলে মরেছে, দেশ যেন বাঁচে।” স্মরণ করি সেইসব তরুণ-তরুণীকে, যারা জীবনের নিরাপত্তা ভুলে হাতে তুলে নিয়েছিল স্বাধীনতার পতাকা।
জাতি আজ তাদের কাছে ঋণী।
এই আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে—গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের নাম নয়, এটা মানুষের অধিকার, সমতা, মর্যাদা ও কণ্ঠস্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি। ইতিহাস বলেছে, কোনো স্বৈরাচার চিরস্থায়ী হয়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিকবার ছাত্রসমাজ-ই হয়েছে পরিবর্তনের প্রেরণা। ২০২৪ সালের আগস্ট সেই উত্তরাধিকার আরও একবার পূর্ণ করল।
এই সময়ের নতুন নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব—এই ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, যাতে কোনো স্বৈরতন্ত্র আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।
লেখাটি উৎসর্গ করা হলো সেইসব শহীদ ছাত্র-ছাত্রী, পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক, মা-বাবা, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের প্রতি, যাদের ত্যাগ ছাড়া বাংলাদেশ আজ মুক্ত হতো না।
মতামত দিন