সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

রূপের সংজ্ঞা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ।

সম্পাদকীয়:

সম্প্রতি এক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সেরা Stylish Fashion Director হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন আডলফ খান নামের এক ব্যক্তি। নেটিজেনরা বলছেন  “সেরা সুদর্শন পুরুষ” হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন আডলফ খান।

যার পোশাক-আশাক, ব্যক্তিত্ব ও অভিব্যক্তি বাংলাদেশের প্রচলিত সাংস্কৃতিক ধারা ও রুচির সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়—এই অভিযোগ উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে। অনেকেই বলছেন, তাঁর চেহারা হয়তো আকর্ষণীয়, তবে তাতে রয়েছে পশ্চিমা প্রভাব, অস্বাভাবিক স্টাইলিং এবং এমন এক রূপবোধ, যা বাংলাদেশি সংস্কৃতির নিজস্ব সৌন্দর্যবোধকে ছাপিয়ে গেছে।


আমরা কী আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সৌন্দর্যবোধ হারিয়ে ফেলছি? এমন নির্বাচন কী আমাদের সমাজে ভুল বার্তা দিচ্ছে?

হ্যা একজন ব্যক্তি তার অনন্য স্টাইল ও উপস্থিতির মাধ্যমে এতো বড় একটি সম্মান অর্জন করায় অনেক তরুণ অনুপ্রাণিত হবেন। শারীরিক রূপের বাইরেও আত্মবিশ্বাস, ক্যারিশমা এবং ক্যারেক্টারকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তাও এতে থাকতে পারে।

বাংলাদেশি সমাজে ফ্যাশনের ক্ষেত্রে একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুন ধারার অনুসরণ দেখা যেতে পারে। এটি আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বরাবরই ছিলো মার্জিত, শালীন ও ব্যক্তিত্বনির্ভর। যখন পশ্চিমা প্রভাব বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ সৌন্দর্য ধারণা আমাদের নিজস্ব ধারাকে ছাপিয়ে যায়, তখন তা আমাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা হারানোর ইঙ্গিত দেয়।

যদি সমাজের ‘সেরা সুদর্শন পুরুষ’ এমন কাউকে মনে করা হয়, যিনি কৃত্রিম রূপ বা বাইরের শোভা দিয়ে মন জয় করেন, তবে তা তরুণদের মধ্যে ভুল মানসিকতা গড়ে তুলতে পারে। ত্বক ফর্সা করা, হেয়ার স্টাইলের জন্য অতিরিক্ত খরচ, কৃত্রিমতা ইত্যাদির প্রতি আসক্তি তৈরি হতে পারে।

অনেকেই বলছেন, এটি আমাদের জাতীয় রুচির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলে। একদিকে যেমন শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আমরা বিশ্বে পরিচিত, অন্যদিকে এমন ‘ফ্ল্যাশি’ উপস্থাপন আমাদের সে পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

অন্যদিকে বিজয়ী ব্যক্তি যদি একবারও দেশীয় পোশাক যেমন পাঞ্জাবি, ফতুয়া, লুঙ্গি বা ধুতি পরে উপস্থিত না হন, এবং তার স্টাইল পুরোপুরি বিদেশনির্ভর হয়, তাহলে তা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে একপ্রকার অযোগ্য ঘোষণা করার সামিল। এই বার্তা প্রচার করে যে, আমাদের নিজস্ব পোশাকে কেউ “সুদর্শন” হতে পারে না—যা একটি জাতিগত হতাশা তৈরি করতে পারে।

যখন তরুণ প্রজন্ম দেখে যে, পশ্চিমা পোশাক, হেয়ার স্টাইল বা কৃত্রিম সৌন্দর্যের মাধ্যমেই “সেরা” হওয়া সম্ভব, তখন তারা নিজের ঐতিহ্যবাহী পরিচ্ছদ ও নিজস্বতার প্রতি আগ্রহ হারায়। এতে তারা নিজেদের শিকড় থেকে বিচ্যুত হয়ে “ফ্যাশনের দাসত্বে” পড়ে যায়।

রূপের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে, এই বিতর্ক তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন তা একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মানসিক গঠনে প্রভাব ফেলে। আডলফ খানের বিজয় আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে—আমরা কীভাবে সৌন্দর্যকে সংজ্ঞায়িত করছি, কীভাবে তা আমাদের তরুণদের মধ্যে আদর্শ হিসেবে প্রভাব ফেলছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক রুচি ও সৌন্দর্যবোধ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

সুন্দর হওয়া দোষের কিছু নয়, তবে “সুন্দর” বলতে আমরা কী বুঝি, সেটিই এখন ভাবনার বিষয়। রূপের নামে যদি আমরা শিকড় হারিয়ে ফেলি, তবে তা নিছকই এক ক্ষণিকের মোহ ছাড়া কিছু নয়।


এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন