সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

বিমান দুর্ঘটনা: এক অশ্রুসিক্ত দিবস, এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি রাষ্ট্র।

সম্পাদকীয়:

২১ জুলাইয়ের দুপুর ছিল রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের জন্য আরেকটি স্বাভাবিক শিক্ষাদিবস। শিশুদের পাঠ চলছিল, শিক্ষকেরা পাঠদান করছিলেন, কেউ কেউ হয়তো জীবনের প্রথম স্বপ্ন আঁকছিল খাতায়।

সেই শান্ত দুপুরেই মুহূর্তে ঝরে গেলো প্রাণ—নিমেষেই রক্তাক্ত হলো স্কুলের মাঠ, পুড়ে ছাই হয়ে গেলো একেকটি শিশু-স্বপ্ন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি ‘এফ-৭ বিজিআই’ প্রশিক্ষণ জেট বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে ঠিক স্কুল প্রাঙ্গণের উপর। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে একাধিক শিশুর, গুরুতর দগ্ধ   হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে আরও অনেকে। এটি কি নিছক কোনো দুর্ঘটনা? নাকি রাষ্ট্রীয় অবহেলার এক নির্মম ফল?

নিহতরা কেবল পরিসংখ্যান নয়, তারা কারও আদরের সন্তান, কারও ছোট ভাই বা বোন, কেউ হয়তো বাবা-মায়ের একমাত্র স্বপ্ন। সাত বছর, দশ বছর কিংবা বারো বছরের একেকটি প্রাণ, যারা ক্লাসে বসে হয়তো কবিতা মুখস্থ করছিল বা গণিতে বিভক্ত করছিল সংখ্যা—তাদের শরীর পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একজন পাইলট বা বিমানসেনা তৈরি হতে যে পরিমাণ সময়, শ্রম ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ লাগে, তার ক্ষয় হয়ে যাওয়া মানে শুধুই একটি জীবন ঝরে যাওয়া নয়—এটি সামগ্রিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর একটি বড় ক্ষতি। এই শোক রাষ্ট্রের—এটা একটি জাতির গর্বের অংশের পতন।

শুধু নিহত নয়, যারা দগ্ধ হয়েছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক-মানসিক আঘাত বয়ে বেড়াবে। তাদের বাবা-মা জীবনের এই ক্ষতি থেকে কোনোদিনই মুক্ত হতে পারবেন না। তাদের শিক্ষা, স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, মানসিক সুস্থতা—সবকিছু চিরতরে বদলে গেলো।

যে বিমানটি বিধ্বস্ত হলো, সেটি বহু পুরনো। দীর্ঘদিন ধরে এই মডেলের বিমান নিয়ে প্রযুক্তিগত জটিলতা, রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতির কথা বিভিন্ন সময়ে শোনা গেছে। প্রশ্ন হলো, জনবহুল রাজধানীর অভ্যন্তরে—তাও একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশ ঘেঁষে—প্রশিক্ষণ বিমান কেন ওড়ানো হচ্ছিল?

বিগত এক দশকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন উভয় ক্ষেত্রেই পুরোনো বিমান ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, আবার কখনো আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এসব পুরোনো, ক্লান্ত যন্ত্রগুলোকে দিয়ে চালাতে বাধ্য করে।

যেসব প্রশিক্ষণ বিমান ২০-২৫ বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেগুলোর যন্ত্রাংশ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থেকে সরবরাহও বন্ধ—তাদের দিয়ে কি ২০২৫ সালের বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব? পুরোনো বিমানের উপর নির্ভরশীলতা কি আরও দুর্ঘটনার ডাক ডাকছে?

এই দুর্ঘটনার আগে কি কোনো পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল? ইঞ্জিন সমস্যার ইঙ্গিত ছিল কি না? যদি থেকে থাকে, তবে কেন তা উপেক্ষা করা হলো? আর যদি হঠাৎ করে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়ে থাকে, তাহলে সেই বিমানটি কি আদৌ আকাশে ওড়ার উপযুক্ত ছিল?

এই প্রশ্নগুলো কেবল তদন্ত কমিটির জন্য নয়—পুরো জাতির সামনে রাখা প্রয়োজন।

শিশুদের মৃত্যু শুধু তাদের পরিবারের নয়, রাষ্ট্রেরও ক্ষতি। এরা ছিল সম্ভাবনার চারা—যারা বড় হয়ে চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক বা সমাজের অগ্রগামী নেতা হতে পারত। এই ক্ষয় গণতন্ত্রের ক্ষয়, উন্নয়নের ক্ষয়, মানবিক মূল্যবোধের ক্ষয়। আর এদের মৃত্যু যে ব্যবস্থার ব্যর্থতায় ঘটেছে, তা সংস্কার না করলে সামনে আরও কত স্বপ্ন এভাবে ছাই হবে, আমরা জানি না।

প্রতিকারের পথ কী?

১. আকাশপথ নিরাপদ করতে জরুরি সংস্কার: জনবহুল এলাকায় প্রশিক্ষণ ফ্লাইট চালানোর নীতিমালা অবিলম্বে পরিবর্তন করতে হবে। প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ অঞ্চল নির্ধারণ করতে হবে।

  1. পুরনো প্রশিক্ষণ বিমানের অবসান: ২০ বছরের বেশি পুরনো যুদ্ধ বা প্রশিক্ষণ বিমান বাতিল করে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

  2. বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা: যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশে সামরিক কার্যক্রম চালালে নিরাপত্তা বলয় তৈরির বাধ্যবাধকতা রাখতে হবে।

  3. আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত ও নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ: শুধু অনুদান নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে নিহত শিশুদের পরিবারের ভবিষ্যত জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

  4. সর্বোচ্চ পর্যায়ের জবাবদিহিতা: সামরিক বা বেসামরিক—যে কোনো দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্য করতে হবে।

আমরা যেন ভুলে না যাই, কেবল মাটিতে পড়া একটি বিমান নয়, আকাশ থেকে ঝরে পড়েছে আমাদের ভবিষ্যৎ। শুধু শোক প্রকাশ নয়, এই শোককে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার রূপান্তর করতে হবে।

জানানো কথা, ঘোষণা দেওয়া, তদন্ত গঠন—এসব যথেষ্ট নয়। এবার যেন পরিবর্তনের সূচনা হয়। আর কোনো মায়ের কোল যেন খালি না হয় রাষ্ট্রের অবহেলায়।

আমরা শোকাহত, কিন্তু আমাদের হৃদয়ের রক্তাক্ত কষ্ট রাষ্ট্রের কাছে একটাই দাবি রাখে—আর নয় অবহেলা, এবার চাই জবাবদিহি ও প্রতিকার।


এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন