সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচনী ব্যবস্থার সন্ধিক্ষণে: PR কি সমাধান, নাকি আরও এক বিপর্যয়ের সূত্রপাত?

সম্পাদকীয়:

নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation বা PR) পদ্ধতি নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রশ্নে এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব।

তবে PR ব্যবস্থার পক্ষে-বিপক্ষে রয়েছে যথেষ্ট যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বিতর্ক—যা বিবেচনায় না রেখে হঠাৎ করে এমন একটি কাঠামোগত পরিবর্তন করা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি।

PR ব্যবস্থার ধারণা ও পজিটিভ দিক:

PR পদ্ধতিতে কোনো রাজনৈতিক দলের জাতীয়ভাবে প্রাপ্ত মোট ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন বরাদ্দ করা হয়। অর্থাৎ যে দল যত শতাংশ ভোট পায়, তত শতাংশ আসন সে পায়। এতে করে জনপ্রিয়তার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে সংসদে।

এই পদ্ধতির বড় সুবিধা হলো—দেশের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও নবীন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়। তারা বড় দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলেও সাধারণ মানুষের একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়। ফলে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় মতের বৈচিত্র্য, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।

PR ব্যবস্থায় ভোট নষ্ট হয় না বলেও অনেকের যুক্তি। যারা জয়ী দলের পক্ষে ভোট না দিলেও, তাদের ভোট সংসদে প্রতিনিধিত্বে রূপ নেয়। ফলে ভোটদাতারা নিজ নিজ দলের পক্ষে ভোট দিতে আগ্রহী হন এবং ভোটদানে অংশগ্রহণ বাড়ে।

PR ব্যবস্থার নেতিবাচক দিক ও বাস্তবতা:

তবে এর অসুবিধাও কম নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এতে স্থিতিশীল সরকার গঠনের সম্ভাবনা কমে যায়। কারণ কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না বললেই চলে, ফলে জোট সরকার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বহু দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জোট সরকার গঠনের সময় মতপার্থক্য, আপোষ, এমনকি অনৈতিক সমঝোতার কারণে প্রশাসনে দুর্বলতা দেখা দেয়।

এছাড়া PR ব্যবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ের জবাবদিহিতা কমে যায়। যেহেতু সংসদ সদস্যরা নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনী এলাকা থেকে সরাসরি নির্বাচিত হন না, বরং দলীয় তালিকা থেকে নির্বাচিত হন—তাদের দায়বদ্ধতা দলীয় নেতৃত্বের কাছে বেশি, জনগণের কাছে কম। এতে করে সাংসদ ও সাধারণ মানুষের সম্পর্ক দূরত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে, যা গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাকে বাধাগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে রাজনীতিতে দলীয় অনুশাসন দুর্বল, নীতি বা আদর্শের বদলে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নেতৃত্ব প্রভাবশালী—সেখানে PR ব্যবস্থা বরং বেশি জটিলতা তৈরি করতে পারে। দলগুলো যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক কাঠামো ঠিক না করে, তবে PR ব্যবস্থায় দলপ্রধানের পছন্দমতো এক শ্রেণির ‘মনোনীত’ সংসদ সদস্যেই সংসদ ভরে যাবে। এতে রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্র ও দুর্নীতির ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।


***বাংলাদেশে বর্তমান প্রথম গতিতে বিজয়ী (First Past the Post) পদ্ধতির যেমন সীমাবদ্ধতা আছে, তেমনি PR ব্যবস্থাও কোনো ম্যাজিক সমাধান নয়। বরং যৌক্তিক হবে একটি মিশ্র (Mixed Electoral System) পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করা, যেখানে একটি অংশ সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে আর অন্য অংশ PR ভিত্তিতে সংসদে যায়। এই পদ্ধতি জার্মানি, নিউজিল্যান্ডসহ বেশ কিছু দেশে সফলভাবে প্রয়োগ হচ্ছে।

তবে এর আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, কার্যকর দলীয় গণতন্ত্র এবং জনগণের প্রতি সাংসদদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সংস্কৃতি। নির্বাচনী ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার হতে পারে শুধুই মাধ্যম—লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও গণতন্ত্রের সুরক্ষা।

এখন কথা হলো PR ব্যবস্থা কি বাংলাদেশে কার্যকর হবে—এই প্রশ্নের জবাব নির্ভর করছে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা ও জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতার ওপর। কোনো পদ্ধতিই নিজে নিজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। চাই রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা, সংস্কারের সাহস এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ার সদিচ্ছা। সংবিধান ও নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে যখন বিতর্ক চলছে, তখন দায়িত্বশীল আলোচনার মধ্য দিয়েই খুঁজে নিতে হবে সবচেয়ে উপযোগী পথ। PR হোক বা FPTP, লক্ষ্য যেন একটাই হয়—সবার জন্য প্রতিনিধিত্বমূলক ও জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র।


এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন