সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

স্মৃতির রক্তিম পাঁজরে হুমায়ুন : এক অমর লেখকের প্রস্থানের ১৩ বছর।

সম্পাদকীয়:

হুমায়ুন আহমেদ : বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য দীপ্তি, চিরস্মরণীয় প্রতিভা

আজ ১৮ জুলাই, বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অসামান্য জনমানুষ  হুমায়ুন আহমেদের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এই দিনটিতে,হাজারো হৃদয়ের প্রিয় মানুষটি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

কিন্তু মৃত্যুর দীর্ঘ ১৩ বছর পরেও তিনি বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়েই জ্বলজ্বল  করে জ্বলছেন।

হুমায়ুন আহমেদের সাহিত্যজীবন ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ, প্রাণবন্ত ও প্রগতিশীল। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস  ‘নন্দিত নরকে’ দিয়েই তিনি সাহিত্যের জগতে প্রবল আলোড়ন তোলেন। এরপর একে একে উপহার দিয়েছেন ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘দেয়াল’, ‘বাদশাহ নামদার’ প্রভৃতি কালজয়ী উপন্যাস। হিমু, মিসির আলি ও শুভ্রর মতো অসাধারণ চরিত্রগুলো তাঁর কলমে পেয়েছে অবিস্মরণীয় রূপ—যা আজও পাঠকের হৃদয়ে জীবন্ত।

কেবল সাহিত্যে নয়, হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রেরও সফল নির্মাতা। তাঁর পরিচালিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ সহ একাধিক চলচ্চিত্র সমালোচক ও দর্শকমহলে বিপুল প্রশংসিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম, মানবিকতা ও বাংলার মাটি–মানুষের গল্পই ছিল তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির মূল প্রাণ। তিনি ছিলেন একাধারে গল্পকার, গীতিকার, গায়ক, রসিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও আবেগনির্ভর একজন বাঙালি—একজন চিরকালীন আবিষ্কারক।

শিক্ষক হিসেবে হুমায়ুন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু লেখালেখির প্রতি তাঁর  দুর্দমনীয় টান তাঁকে পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত করে। তিনি বাংলা সাহিত্যের পাঠকগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেন। সাধারণ মানুষ, যারা আগে বইয়ের প্রতি অনীহা দেখাত, হুমায়ুন আহমেদের কল্যাণে তারাও বইমুখো হয়।

তাঁর জীবন ছিল ঘটনাবহুল—নানা আলোচনায়, সমালোচনায়, প্রেমে, বিরহে, রাজনীতির ছায়ায় থেকেও তিনি  কখনও কালি ঝরানো থামাননি। তাঁর শেষ বয়সে ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও বাঁচানো যায়নি তাঁকে। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই (বাংলাদেশ সময় ১৮ জুলাই) নিউ ইয়র্কে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কালজয়ী কথাশিল্পী।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা কেবল একজন সাহিত্যিককে নয়, বরং একটি সময়কে, একটি ধারাকে, একটি শক্তিকে স্মরণ করছি। তাঁর মতো প্রভাবশালী সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে খুব কমই এসেছেন, যিনি একাধারে শিশু  থেকে বৃদ্ধ, শহর থেকে গ্রাম—সব শ্রেণির পাঠকের মনে জায়গা করে নিতে পেরেছেন।

বাংলাদেশের পাঠকসমাজে হুমায়ুন আহমেদ শুধু প্রিয় নন, তিনি এক ধরনের নস্টালজিয়া, এক চিরন্তন অনুভব। আজ  তাঁর মৃত্যুবাষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি। তাঁর সাহিত্য, সৃষ্টিশীলতা ও গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের পথ চলার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক।

এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন