“আত্মসমালোচনা ছাড়া প্রকৃত প্রগতি আসবে না”।
সম্পাদকীয়:
একটি জাতির অগ্রগতির মূল শর্ত হলো—সত্যকে স্বীকার করার সাহস। ব্যক্তি হোক বা প্রতিষ্ঠান, যে ভুলকে স্বীকার করে না, সে শুধু নিজের অচলায়তনকেই টিকিয়ে রাখে।
যে সমাজ ভ্রান্তিকে ঢেকে রাখতে চায়, সেখানে প্রগতি আসে না। বরং ভণ্ডামি, অক্ষমতা আর আত্মপ্রবঞ্চনার বিষবৃক্ষ গজিয়ে ওঠে।
আমাদের পরিবার, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র—প্রায় সবক্ষেত্রেই আমরা একটি সাধারণ প্রবণতা দেখি। মানুষ চায় নিজের সাফল্য দেখাতে, চায় বাহবা পেতে। কিন্তু সেসব সাফল্যের পেছনে যে ভুল, যে বিচ্যুতি, যে অবহেলা থাকে, তা স্বীকার করার মানসিকতা আমাদের কমই দেখা যায়। আমরা অজুহাত তৈরি করি—‘পরিস্থিতি এমন ছিল’, ‘আমার কোনো দোষ নেই’, ‘সবাই তো এমনই করে’।অথচ এই অজুহাত আসলে সমস্যার চিরস্থায়ী জঞ্জাল।
একটি ছোট উদাহরণ ভাবুন। যদি শিক্ষার্থী তার পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল হওয়ার কারণ খুঁজে না বের করে—সে কোন অধ্যায় না পড়েছে, কোথায় মনোযোগ দেয়নি—তাহলে সে আর কোনোদিনই ভালো করতে পারবে না। ঠিক তেমনি, একটি প্রতিষ্ঠান যদি বারবার সেবা ব্যর্থতার পরও অস্বীকার করে যে তারা ভুল করেছে, তবে সেখানে উন্নয়ন অসম্ভব।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও চিত্র আলাদা নয়। প্রশাসন বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভুল নীতি, দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা যদি স্বীকার না করা হয়, তবে সমাধানের প্রাথমিক ধাপই শুরু হবে না। মানুষ বিভ্রান্ত হবে, আস্থাহীনতা জন্ম নেবে, আর সেই আস্থার সংকট থেকে নতুন সংকট তৈরি হবে।
তাই উন্নত দেশগুলোর মূল শিক্ষা হলো—ভুল ধামাচাপা নয়, ভুলকে চিহ্নিত করা। যদি সঠিক রোগ নির্ণয় না হয়, তাহলে কোনো ওষুধই কার্যকর হবে না। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—সবক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনা শক্তি নয় কি দুর্বলতা নয়। এটি সর্বোচ্চ আত্মবিশ্বাস ও বিবেকবোধের প্রমাণ।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সমাজে এই স্বীকারোক্তির চর্চা প্রায় অনুপস্থিত। অফিসে বস ভুল করলে অধীনস্তকে দোষ চাপান। শিক্ষক নিজে ঠিকমতো না পড়িয়ে শিক্ষার্থীর ‘মেধার অভাব’ খুঁজে পান। রাজনীতিকরা নিজেদের ব্যর্থতাকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে চালিয়ে দেন।এমন সংস্কৃতিতে সমস্যার শিকড় দিনে দিনে এত গভীরে যায় যে, কোনো পরিবর্তনের আলো আর দেখা যায় না।
আমাদের মনে রাখতে হবে—ভুলের কথা স্বীকার করা মানেই লজ্জা নয়, বরং সমাধানের শুরু। আত্মসমালোচনা মানে দুর্বলতা নয়, বরং বিবেকের শক্তি। মানুষ যখন নিজেকে প্রশ্ন করে—“আমি কোথায় ব্যর্থ হলাম?”, তখনই নতুন বিকাশের দুয়ার খোলে।
আজ আমাদের পরিবারে, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যখাতে, প্রশাসনে—সবখানেই এই আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়তে হবে। নেতৃত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদের দায়িত্ব আরও বেশি।কারণ, তাঁদের সৎ স্বীকারোক্তি সমাজে সাহসের অনুকরণ তৈরি করে।
ভুলকে অস্বীকার করলে সমাধানের দ্বার চিরকাল বন্ধই থেকে যায়।
এই কথাটি শুধু উপদেশ নয়—এটি প্রতিটি প্রগতির মূলমন্ত্র।
আমাদের উচিত এই বোধের চর্চা শৈশব থেকেই শুরু করা। ছোটবেলা থেকে সন্তানদের শেখাতে হবে—ভুল হওয়া লজ্জার নয়, ভুল ঢেকে রাখা লজ্জার। একজন শিশু যখন স্বীকার করে “হ্যাঁ, আমি ভুল করেছি,” তখনই তার বিবেকবোধের বিকাশ ঘটে। পরিবারে, বিদ্যালয়ে এবং সমাজে সত্য বলা ও ভুল চিহ্নিত করার সংস্কৃতি তৈরি হলে প্রজন্ম পরম্পরায় সৎ, দায়িত্ববান নাগরিক গড়ে উঠবে। এই শিক্ষার বীজ যত তাড়াতাড়ি রোপণ করা যায়, ততই সুস্থ মানসিকতা ও প্রগতিশীল সমাজ গড়া সম্ভব হবে।
এখন সময় এসেছে আমরা এই সত্যকে অন্তরে ধারণ করি। ব্যক্তি হোক বা প্রতিষ্ঠান, যে দিন আমরা আমাদের ভুল স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে শিখব, সেদিন থেকে আমাদের উন্নয়নের গল্পও সত্যি হবে। আত্মপ্রবঞ্চনা আর অজুহাতের আবরণ ছিঁড়ে ফেলাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় বিজয়।
এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক
মতামত দিন