সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

“জনগণের মৌলিক অধিকার আজ বাণিজ্যের বাজারে বন্দী”।

সম্পাদকীয়:

স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে গেলেও আজও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যখন হাসপাতালে যায়, তখন তার ভরসা থাকে ক্ষীণ—আর ভয় থাকে অসীম। এই ভয় কোনো মরণব্যাধির নয়—ভয় হাসপাতালের দালালদের, ভুয়া রিপোর্টের, অযৌক্তিক বিলে সর্বস্বান্ত হওয়ার।
রাষ্ট্রযন্ত্র, নীতিমালা, আইনকানুন—সবই আছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের প্রয়োগের চিত্র বেদনাদায়ক।
একদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবা অনিশ্চিত, অপরদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলো যেন রীতিমতো মুনাফার কারখানা। কয়েকটি প্রাইভেট হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার চক্রবদ্ধভাবে রোগীকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করায়, বেড ভাড়া, ডাক্তারের ফি, ওষুধের নামে অবিশ্বাস্য বিল তৈরি করে। টাকার বিনিময়ে জীবনরক্ষা নয়—জীবন নিয়ে বাণিজ্য চলে।
এক সময় সরকারি হাসপাতাল ছিল গরিব মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু এখন সেখানে প্রবেশ করলেই রোগী ও তার স্বজনকে মুখোমুখি হতে হয় দালালদের অবাধ দৌরাত্ম্যের। বহির্বিভাগের বুথ থেকে শুরু করে ওয়ার্ডের খাট—প্রতিটি কোণায় এই অদৃশ্য সিন্ডিকেটের শিকল। রোগীকে কখন কোন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাবে, কত টাকার কমিশন হবে, কোন টেস্ট করানো হবে—সব নির্ধারিত থাকে অদৃশ্য চুক্তিতে।
এদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোও অনেকাংশে দায়িত্বজ্ঞানহীন বানিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে রোগীর প্রয়োজন নয়, চিকিৎসার অজুহাতের গুরুত্ব বেশি। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, মিথ্যা ভয় দেখিয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত বেডচার্জ—সবকিছু যেন অর্থ উপার্জনের পরিকল্পিত ফাঁদ। কোনো কোনো হাসপাতালে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রোগীকে আইসিইউতে নেয়া হয়, যেখানে এক রাতের বিলই লাখ টাকা ছুঁতে পারে। রোগীর পরিবার তখন প্রিয়জন বাঁচানোর আর্তনাদ আর অর্থসংকটের বিভীষিকায় অসহায়।
এই অমানবিক চিত্র নতুন নয়। সংবাদমাধ্যমে বারবার এই দুর্নীতি প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ভোক্তা অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদারকি সংস্থা কিছুদিনের মধ্যে ‘অভিযান’ চালিয়ে কিছু জরিমানা করে এবং বিষয়টি মুছে যায়। অথচ এই সমস্যা কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসার নয়—এটি দেশের মৌলিক জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়।
যেখানে স্বাস্থ্যসেবা একটি রাষ্ট্রের মানুষের অন্যতম প্রাথমিক অধিকার, সেখানে তা যদি কেবল ব্যবসার পণ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজে বিভক্তি, অসাম্য ও অনাস্থা জন্ম নেবে। মানুষ তখন আর সরকারে আস্থা রাখবে না, রাখবে না সিস্টেমে বিশ্বাস। এই অনাস্থার ফলাফল হবে ভয়াবহ।
এখন আর শুধু কথার সময় নেই। দরকার কার্যকর ব্যবস্থা: ১. সরকারি হাসপাতালে দালালচক্র উচ্ছেদে স্থায়ী কমিটি:
প্রতিটি হাসপাতালে আলাদা সেল গঠন করতে হবে, যেখানে সিসিটিভি মনিটরিং, অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যবস্থা থাকবে। দালালদের আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

২. বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা মূল্য নির্ধারণ:
অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা, শল্যচিকিৎসা, টেস্ট—সবকিছুর সর্বোচ্চ মূল্য সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত করতে হবে। এই প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করলে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাতে দিতে হবে।

৩. ভুয়া টেস্ট ও অপপ্রচার রোধে বিশেষ অডিট দল:ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে অনুমোদিত পরীক্ষার তালিকা প্রকাশ করতে হবে। রোগী চাইলে অন্য সেন্টার থেকেও টেস্ট করাতে পারবে। অপ্রয়োজনীয় টেস্টে প্রমাণ হলে আর্থিক জরিমানা ও লাইসেন্স স্থগিত করতে হবে।


৪. রোগী হয়রানির অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার:
সারা দেশে হেল্পলাইন চালু করে অভিযোগের সমাধান ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত রোগীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৫. সরকারি হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়ন ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিতে কঠোর মনিটরিং:
সদ্য প্রকাশিত জরিপ বলছে, সরকারি হাসপাতালে ওষুধের চুরি, ঘাটতি এবং মানহীন সেবা সবচেয়ে বড় দুর্নীতি। এই ঘুণপোকা রোধ করতে নিয়মিত অডিট ও শাস্তি প্রয়োগ অপরিহার্য।

৬. সচেতনতা এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের চর্চা:চিকিৎসক সমাজকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে—তারা স্রেফ পেশাজীবী নন, মানবসেবার ব্রত নিয়ে শপথ করা মানুষ।

৭. স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সরাসরি নজরদারি ও তদারকি বৃদ্ধি:
মন্ত্রীর দায়িত্ব শুধু নীতি প্রণয়ন নয়, মাঠ পর্যায়ে সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
আজ আমাদের মনে রাখতে হবে, অসুস্থতা যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনি স্বচ্ছ ও সুলভ চিকিৎসার নিশ্চয়তা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। যেখানে মানুষ বাঁচার আশায় হাসপাতালের দ্বারস্থ হয়, সেখানে লুণ্ঠন আর অবহেলার গল্প লেখা লজ্জাজনক। একটি উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে স্বাস্থ্যসেবা হবে না ব্যবসার হাতিয়ার—হবে মানুষের মৌলিক অধিকার, সম্মানের অধিকার। এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। দালালমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, সুশাসনসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে কড়া নজরদারি, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা—সবকিছু একসাথে প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আর কোনো ছলচাতুরি নয়। মানুষের জীবন বাঁচানোই হবে আসল উন্নয়নের মানদণ্ড


এম সুজন হোসাইন সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন