সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

‘ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণ: গণতন্ত্রের বিজয় না ভবিষ্যতের সংকট?’

সম্পাদকীয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘ক্ষমতা’ একটি কেন্দ্রবিন্দু—যা ঘুরে ফিরে দেশে গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, নির্বাচন, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিমত্তার গতিপথ নির্ধারণ করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, প্রধানমন্ত্রীর ১০ বছরের মেয়াদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের একটি প্রস্তাব এসেছে।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। মূলত, "দুই বার" নাকি "দুই মেয়াদ" এই নিয়ে বিতর্ক ছিল, তাই মেয়াদ সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। বিবিসি বাংলা অনুযায়ী এই প্রস্তাবটি মূলত একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার অংশ, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো এই বিষয়ে একমত হয়েছে। এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য হল প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ধারাবাহিকতা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষায়—‘গণতন্ত্রকে রক্ষার পথে এটি একটি বড় অগ্রগতি এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিরোধ’। এই প্রস্তাব নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য, যা বাংলাদেশে ‘চিরস্থায়ী ক্ষমতার ধারা’কে প্রশ্নের মুখে ফেলে। কিন্তু এই প্রস্তাব শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যে বিচার করলে চলবে না—এর পেছনের রাজনৈতিক বাস্তবতা, ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক এবং প্রয়োগযোগ্যতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ জরুরি। ইতিবাচক দিক: গণতান্ত্রিক সীমা নির্ধারণের নতুন দ্বার ১. স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা রোধ:
দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা কেবল ব্যাক্তিগত একনায়কত্ব তৈরি করে না, তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শৃঙ্খলিত করে ফেলে। ইতিহাসে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে সমালোচনা গ্রহণের সক্ষমতা হ্রাস পায় এবং ক্ষমতাকে নিজের অধিকার মনে করার প্রবণতা জন্ম নেয়। এটি সেই ধারাকে থামানোর সাহসী পদক্ষেপ। ২.নেতৃত্বের নবায়ন ও নবপ্রজন্মের সুযোগ:
রাজনৈতিক নেতৃত্বের রক্ত সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজন সময়োচিত পরিবর্তন। ১০ বছর পর বাধ্যতামূলক অবসান মানে নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব—যা রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন চিন্তা ও নতুন কৌশল উদ্ভাবনে বাধ্য করবে। ৩.প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতির পরিবেশ:
ক্ষমতার নির্দিষ্ট সীমা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে সহজতর করে। জনগণ জানবে, নির্দিষ্ট সময় পর পরিবর্তন আসবে, ফলে ভোটের মাধ্যমে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও আগ্রহ বাড়বে। ৪.গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে: প্রধানমন্ত্রী পদকে সীমাবদ্ধ করলে সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। ব্যক্তির উপর রাষ্ট্র নির্ভর না করে প্রতিষ্ঠান নির্ভরতা বাড়বে। নেতিবাচক দিক: গণতন্ত্রে ‘অতিরিক্ত সীমা’ কখনো বিপরীতমুখীও হতে পারে ১. জনগণের ইচ্ছার বিপরীতে বাধা:
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি—জনগণের ইচ্ছা। যদি জনগণ বারবার কাউকে নির্বাচিত করতে চায়, তবে সাংবিধানিকভাবে তা আটকে দেওয়ার মানে জনগণের স্বাধীনতা খর্ব করা। এটি স্বেচ্ছাচার রোধ করলেও, জনইচ্ছাকে সীমাবদ্ধ করার ঝুঁকি আছে। ২.যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব হারানোর আশঙ্কা:
কোনো প্রধানমন্ত্রী যদি দক্ষতা, সততা ও দূরদৃষ্টিতে প্রমাণিত হন—তবে মাত্র ১০ বছরে তাঁকে বিদায় জানাতে হবে। এতে নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। ৩.রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে:
দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন প্রকল্প বা কূটনৈতিক চুক্তিগুলোর বাস্তবায়নে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। ১০ বছরের সীমা উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ছেদ ফেলতে পারে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে যেখানে নেতৃত্ব বদল মানেই নীতির আমূল পরিবর্তন। ৪.প্রয়োগযোগ্যতা ও বাস্তবতা
প্রশ্নসাপেক্ষ:
কোনো সরকার নিজ ক্ষমতার সীমা নিজে নির্ধারণ করবে—এটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুর্লভ। প্রশ্ন আসে: এটি কে প্রস্তাব করবে? কীভাবে সাংবিধানিকভাবে প্রণয়ন হবে? বর্তমান সরকার এটা গ্রহণ করবে কি? না এটি বিরোধীদলীয় প্রচারণার অংশ? এসব প্রশ্নের সমাধান না হলে প্রস্তাবটি শুধু বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। ভারসাম্য ও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট সালাহউদ্দিন আহমদের অন্যান্য মন্তব্য—বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং তিনটি শক্তির (আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ) ভারসাম্য—এই প্রস্তাবকে এক ভিন্ন মাত্রা দেয়। কারণ শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং সেই সঙ্গে সকল স্তরে জবাবদিহিতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি যথার্থই বলেছেন—“শুধু নির্বাহী ক্ষমতা খর্ব করে গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করা যাবে না।” বরং চাই ব্যবস্থাগত সংস্কার, যেখানে এক বিভাগ আরেকটিকে নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং পারস্পরিক সহাবস্থানে কাজ করে। ⸻ উপসংহার প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করার প্রস্তাব শুধু একটি আইন নয়, এটি একটি রাজনৈতিক চেতনার প্রতিফলন—যা বলে, ক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। তবে এ ধরনের উদ্যোগ কেবল মুখে বললে চলবে না, চাই বাস্তবায়নের সুসংগঠিত নীতিমালা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব হতে পারে, যদি তা কেবল বিরোধিতা বা ক্ষমতার খেলার অংশ না হয়ে—গণতান্ত্রিক সংস্কারের আন্তরিক প্রচেষ্টা হিসেবে আবির্ভূত হয়। কেননা, আমাদের এই রক্তাক্ত রাজপথের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে—যেখানে ক্ষমতার সীমা থাকবে, কিন্তু গণতন্ত্রের বিস্তার হবে সীমাহীন।
এম সুজন হোসাইন সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন