সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

আকাশে বন্দি ভারত: এক অদৃশ্য কারাগারের রাজনৈতিক প্রতিচ্ছবি।

সম্পাদকীয়: ভারত যেন হঠাৎ করেই এক অদৃশ্য আকাশ-কারাগারে বন্দি হয়ে পড়েছে। পশ্চিমে পাকিস্তান, উত্তরে চীন, আর মাঝখানে ইরান—সবমিলিয়ে চারদিকের আকাশপথ আজ ভারতের জন্য কার্যত বন্ধ।
এই অবরুদ্ধ অবস্থান শুধু ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল শিল্পকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়নি, বরং দেশটির বৈশ্বিক সংযোগ, অর্থনৈতিক উচ্চাশা এবং কৌশলগত সার্বভৌমত্বকেও গভীর সংকটের মধ্যে ফেলেছে। একটি জাতির আকাশপথ রুদ্ধ হওয়ার অর্থ কী? আকাশপথ একটি দেশের জন্য কেবল যোগাযোগ মাধ্যম নয়—এটি বাণিজ্য, কূটনীতি ও কৌশলগত ক্ষমতার দিক থেকেও এক অপরিহার্য সম্পদ। ভারতের জন্য এই আকাশ-অবরোধ যেন এক বিষাক্ত চক্রের প্রতীক। এই চক্রের প্রতিটি দেয়াল আলাদাভাবে নির্মিত, কিন্তু মিলিত হয়ে তৈরি করেছে এক নিখুঁত ‘গোলকধাঁধা’। পাকিস্তান: প্রথম দেয়াল বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে প্রাকৃতিক ও কার্যকর আন্তর্জাতিক আকাশপথ—পশ্চিমমুখী ‘এরিয়াল করিডর’টি—রুদ্ধ হয়ে গেছে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থার কারণে। এই করিডরটি দিয়ে ভারতীয় উড়োজাহাজ সরাসরি ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় পৌঁছাতে পারত, যা সময় এবং খরচ উভয়দিক থেকেই ছিল সর্বাধিক সুবিধাজনক। ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির কারণে ইরান তার আকাশসীমা সাময়িক ভাবে সকল দেশের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে ইরানের এই সংঘাতের কোনও সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকলেও, এর প্রভাব ভারতে পড়েছে সরাসরি ও মারাত্মকভাবে। পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ হওয়ার পর, ভারত যে বিকল্প পথ হিসেবে ইরানের আকাশ ব্যবহার করছিল, সেই পথও এখন অবরুদ্ধ। এটি এক ক্লাসিক ‘Collateral Damage’ — যখন একদল খেলছে, আর আরেক দল ভুগছে। চীন ও উত্তরের প্রতিবন্ধকতা উত্তরের পথে হিমালয়ের অপ্রতিরোধ্য প্রাকৃতিক বাধার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে বৈরী রাজনৈতিক সম্পর্কও ভারতের আকাশ পথকে সংকুচিত করেছে। এই পথ ব্যবহার করতে হলে ভারতকে কূটনৈতিক একঝাঁঝা মোকাবিলা করতে হয়, যা কার্যত অসম্ভব। 🛫 বিকল্প পথ: দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ এই আকাশ-কারাগারে ভারতের একমাত্র মুক্ত পথ এখন দক্ষিণে—আরব সাগরের ওপর দিয়ে ঘুরপথে ইউরোপে যাত্রা। এই পথ কেবল দীর্ঘ নয়, অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জ্বালানিনির্ভর। উদাহরণস্বরূপ, মুম্বাই থেকে ফ্রাঙ্কফুর্টের সাধারণ দূরত্ব ৬,৬০০ কিলোমিটার। কিন্তু নতুন ঘুরপথে যেতে হচ্ছে প্রায় ১০,১০০ কিলোমিটার। সময় বেড়েছে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা, আর খরচ বেড়েছে লক্ষ লক্ষ ডলার—যা বিমান সংস্থাগুলোর দেউলিয়া হওয়ার পথে ঠেলে দিচ্ছে। কৌশলগত সংকেত এবং অদূর ভবিষ্যৎ এই অবস্থা শুধু পরিবহন সংকট নয়, বরং কৌশলগত পরাজয়ের শঙ্কা। একটি দেশের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু বিমানের গতিপথ নয়—সে দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও কৌশলগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়া। ভারত আজ বুঝতে পারছে—শুধু স্থল ও সমুদ্র নয়, আকাশও একটি যুদ্ধক্ষেত্র। যেখানে প্রতিপক্ষের রাজনীতি, সংঘাত এবং কৌশল আপনার স্বাধীনতাকে চেপে ধরতে পারে—চোখের পলকেই। এই সংকট থেকে শিক্ষার সুযোগ ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সকলকেই একটি বড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়— একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য আকাশপথ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আর সেটি রক্ষার কৌশলই বা কী? প্রযুক্তি, কূটনীতি, প্রতিরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক জোট—সবকিছুর সমন্বয় ছাড়া আগামী দিনের স্বাধীনতা শুধু ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, আকাশেও বাধা হয়ে দাঁড়াবে


এম সুজন হোসাইন সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন