ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাদের অজানা শত্রু।
সম্পাদকীয়:
২০২৫ সালের জুন মাসের এই দিনে বিশ্ব নতুন এক উত্তেজনার মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরে জানা গেছে—যুক্তরাষ্ট্র ১৩,৬০০ কেজি ওজনের একটি বিশাল বোমা নিক্ষেপ করেছে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে।
তথাকথিত “জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে” এই হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ—ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছিল।
কিন্তু সত্যিই কি তাই?
ইরানের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল?
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা IAEA বারবার জানিয়েছে, ইরান তার পারমাণবিক প্রযুক্তি শান্তিপূর্ণ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করছিল।
তাদের কাজ অনেকটা বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতোই।
তবে আমেরিকা ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহের বশে এই প্রকল্পগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, এই বোমা হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল প্রকৃত স্থাপনাগুলো নয় বরং ‘ডেমো ফ্যাসিলিটি’—যা ইরান পূর্বেই বুঝে গিয়েছিল টার্গেট হবে।
“ইরানের ভিতরে আরেকটা ইরান”
ইরান ১৯৮০ সাল থেকেই বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে আসছে।
মাটির নিচে সুচিন্তিত বাংকার, ল্যাবরেটরি, প্রতিরক্ষা অবকাঠামো এবং মোবাইল সিস্টেম—এগুলো ইরানকে করে তুলেছে আরও সুসংগঠিত ও প্রস্তুত।
যেমনটি আমরা দেখেছি ফিলিস্তিনে হামাসের টানেল স্ট্র্যাটেজিতে।
এই কৌশলগুলোর পেছনে ইরানি বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির হাত রয়েছে বলে বিশ্বজুড়ে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।
“জোর যার, মুল্লুক তার” — বাস্তবতা কতটা নির্মম!
আচ্ছা, যদি কাল আমেরিকা বা ভারত বলে বসে—“সেন্ট মার্টিন আমাদের চাই”, “বঙ্গোপসাগরে আমরা নৌঘাঁটি করবো” কিংবা “পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের নিরাপত্তার জন্য দরকার”—তখন আমরা কী করবো?
উত্তরটা বাস্তবতায় খুবই হতাশাজনক: আমরা কিছুই করতে পারবো না।
আমাদের নেই শক্তিশালী বিমান বাহিনী, মিসাইল প্রযুক্তি, ড্রোন, কিংবা পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা।
আর এই দুর্বলতার সুযোগেই বড় শক্তিগুলো মিথ্যা অভিযোগের বর্মে হামলা চালায়।
ইরান একা, কিন্তু প্রস্তুত
যুদ্ধে জয় মানেই শুধু দখল নয়—ধ্বংসও এক ধরনের জয়। ইরান হয়তো দখল হবে না, কিন্তু যদি ৫০ বছর পিছিয়ে পড়ে, সেটাই তো শত্রুর কৌশল।
এই মুহূর্তে ইরান একাই দাঁড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো দুইটি পরমাণু শক্তিধর দেশের মুখোমুখি হয়ে।
কিন্তু ইরান একা হয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। হামলার কিছু সময়ের মধ্যেই ৩০টিরও বেশি মিসাইল ছুড়েছে ইসরায়েলের দিকে।
এমনকি এখনও কোনো বড় ধরনের রেডিয়েশন বা ভেতর থেকে ধ্বংসের চিত্র পাওয়া যায়নি।
ইরানিদের আসল অস্ত্র: বুদ্ধিমত্তা
এক জরিপ অনুযায়ী, ইরানিরা বিশ্বের অন্যতম উচ্চ আইকিউসম্পন্ন জাতি।
তারা শুধু সাহসী নয়, চূড়ান্ত বুদ্ধিমান।
তাই হয়তো বারবার অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা, হুমকি—সবকিছুর পরও আজও মাথা নত করেনি।
বুদ্ধিমত্তা, কৌশল ও আত্মবিশ্বাস—এই তিন অস্ত্র দিয়েই ইরান প্রমাণ করেছে, বিমান হানায় হয়তো শহর ধ্বংস হয়, কিন্তু জাতি নয়।
বন্ধু থাকবে না, থাকেও না
ইরান এই যুদ্ধে প্রবেশ করার আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল—যদি যুক্তরাষ্ট্র হামলা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিগুলোও হামলার আওতায় পড়বে।
কিন্তু তবুও কেউ পাশে দাঁড়ায়নি।
চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক—কে আসলো? কেউ না।
যেমনটা আমাদের দেশেও আমরা অনেক সময় ভাবি, “আমাদের কিছু হলে চীন-পাকিস্তান আসবে”—কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এইসব ধারণা শিশুতোষ।
আমাদের জন্য শিক্ষা কী?
আমরা কি প্রস্তুত?
আমাদের কি বিকল্প শক্তি আছে?
আমরা কি কূটনীতিতে, প্রতিরক্ষায়, প্রযুক্তিতে, গণমাধ্যমে, জাতীয় ঐক্যে প্রস্তুত?
উত্তরটা আমরা জানি।
তাই এখনই সময়—স্বাধীনতাকে কেবল গান-বাজনা নয়, বাস্তব প্রস্তুতির ভিতেও গেঁথে নিতে হবে।
এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন