দীর্ঘ ২০ বছর পর সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের যাত্রা শুরু।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে নিশ্চিত হওয়া গেছে কারা বিরোধী দলের আসনে বসছে। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের আসনে বসছে জামায়াতে ইসলামী।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের উপস্থিতি সরকারের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করে। জনগণের বক্তব্য তুলে ধরার মাধ্যমে তারা সরকারকে কল্যাণকর ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে পরিচালিত করেন। তবে দেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরোধী দলের ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকলেও গত তিনটি সংসদে কার্যত বিরোধী দল অনুপস্থিত ছিল। স্বল্পসংখ্যক আসনে জাতীয় পার্টি সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের যৌথ ভূমিকা রাখলেও তা কার্যকর হয়নি। নবম সংসদে বিএনপি বিরোধী দলে থাকলেও আসনস্বল্পতার কারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অন্যদিকে অষ্টম সংসদে বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সংসদে কার্যকর বিরোধী দল থাকা জরুরি। তবে বিগত কয়েকটি সংসদে অনুগত বা গৃহপালিত বিরোধী দল দেখা গেছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এবার নির্বাচনে তা পরিবর্তিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন নিয়ে যারা বিরোধী দলের আসনে বসবেন, তারা সংসদকে কার্যকর করতে যথাযথ ভূমিকা রাখবেন।’
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে জামায়াতে ইসলামী। এছাড়া ছয়টি আসনে জয়ী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), একটি করে আসনে জয়ী ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল এবং কিছু স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন।
সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের এক মাসের মধ্যে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে। এর আগে দলীয় ভোটে বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতা নির্বাচিত হবেন এবং স্পিকারের কাছে তা জানানো হবে। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি ২(১)(ট) ধারা অনুযায়ী, ‘বিরোধী দলের নেতা’ হলো সরকারি দলের বিরোধিতাকারী সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্য নিয়ে গঠিত দল বা অধিসংঘের নেতা। স্পিকার বিরোধী দলের স্বীকৃতি প্রদান করেন।
সংসদ সচিবালয় জানায়, প্রথম ও ষষ্ঠ সংসদে কোন বিরোধী দল ছিল না। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়েছিল। ষষ্ঠ সংসদে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। প্রথম দৃশ্যমান বিরোধী দলের ভূমিকা দেখা যায় ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে। তৃতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি সরকার গঠন করলে ৭৬টি আসনে জয়ী আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের আসনে বসে এবং শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন।
পঞ্চম জাতীয় সংসদে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়ী হয় এবং ১৮টি আসনে জয়ী জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসনে বিরোধী দলের আসনে বসে, শেখ হাসিনা নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এটি দেশের সবচেয়ে কার্যকর সংসদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সপ্তম সংসদে আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে, আর বিএনপি ১১৬টি আসনে বিরোধী দলের আসনে বসে। অষ্টম সংসদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে, বিরোধী দলের নেতা হিসেবে বসেন শেখ হাসিনা। নবম ও দশম সংসদে জাতীয় পার্টি ডামি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে।
এবার ত্রয়োদশ সংসদে পূর্বের তুলনায় আরও শক্তিশালী এবং কার্যকর বিরোধী দলের উপস্থিতি আশা করা হচ্ছে, যা সংসদের কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ এবং ফলপ্রসূ করবে।
মতামত দিন