জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতের ইশতেহার প্রকাশ।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়।
ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। দলটি জানিয়েছে, তাদের মূল লক্ষ্য একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।
জামায়াতের ঘোষিত পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের মাধ্যমে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
ইশতেহারে যুবসমাজকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তরুণদের ক্ষমতায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অগ্রাধিকার এবং নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নারীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গড়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের মাধ্যমে স্মার্ট ও ডিজিটাল সমাজ গঠনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তি, শিল্প, কৃষি ও উৎপাদন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি বাতিল, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং বৈষম্যহীন চাকরি ব্যবস্থার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগবান্ধব ও স্বচ্ছ অর্থনীতি গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির নির্বাচন চালু, সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অতীতে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মানবাধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
ইশতেহারে জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কৃষকদের সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে কৃষি বিপ্লব ঘটানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
দলটি জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ, বর্জ্য ও বন্যা ঝুঁকি শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে ‘তিন শূন্য’ ভিশন বাস্তবায়ন করা হবে। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, ভারী শিল্প স্থাপন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং বিশেষ করে নারীদের জন্য ঝুঁকিমুক্ত কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে রাষ্ট্র গঠনে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বিভাজনের বাইরে গিয়ে সকল নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ধাপে ধাপে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার, সমসাময়িক বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষার পরিকল্পনাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখা এবং মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যাতায়াত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের অংশ হিসেবে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে সড়ক ও রেল যোগাযোগের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বল্প ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
ইশতেহারের শেষাংশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরুত্থান ঠেকাতে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং সব পর্যায়ে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে জামায়াত তাদের কর্মসূচির সমাপ্তি টানে।

মতামত দিন