রাজনীতি
ছবি: সংগৃহীত

"প্রয়োজন ছিল বলেই দেশ ছাড়ি",সাক্ষাৎকারে ওবায়দুল কাদের।

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঢাকা,আজ মঙ্গলবার ২৭ মে ২০২৫:

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অতীতের গণআন্দোলন, দলীয় সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত অবস্থান নিয়ে নাগরিক টিভির এক দীর্ঘ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে মুখ খুলেছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সাক্ষাৎকারে বেশ কয়েকবার উত্তেজিত হয়ে ওঠেন তিনি।

নাগরিক টিভির ইউটিউব চ্যানেলের প্রধান সম্পাদক নাজমুস সাকিবের সঙ্গে আলাপে কাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর দেন, আবার কিছু প্রশ্নে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেন।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই সাকিব ৫ আগস্টের গণআন্দোলনের সময় ভারতের একটি গণমাধ্যমে দেওয়া কাদেরের বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চান—তিনি সত্যিই কি বাথরুমে লুকিয়েছিলেন? কাদের এর উত্তরে বলেন, "এছাড়া আর কোনো উপায় তো ছিল না!" সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করেন ছাত্রদের সহায়তায় তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন কিনা, কাদের সম্মতি দিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, এটাও ঠিক।”

তবে আলাপের পরবর্তী অংশে উত্তপ্ততা বাড়ে। সাকিব বলেন, “অনেকে বলছেন, তখন মানুষের আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভ এতটাই ছিল যে ছাত্ররা আপনাকে রক্ষা করেছে—এই ব্যাখ্যাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।” জবাবে কাদের বলেন, ‘ওরা বলেছিল, আপনার প্রতি রাগ ছিল, কিন্তু সামনে এসে রাগটা পানি হয়ে গেছে।’

এরপর প্রশ্ন আসে—কাদের দেশ ছেড়ে কীভাবে গেলেন, কারা তাকে সহায়তা করল? উত্তরে তিনি বলেন, “তিন মাস পরে যখন বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি, অভিযান শুরু হয়, তখন শরীরও ভেঙে পড়ছিল।আমি অনেক ওষুধ খাই, ভেবেছিলাম গ্রেফতার হলে ওষুধ খাওয়ার সুযোগ থাকবে না। এসব বিবেচনায় দেশ ছাড়ি।”

১৫ বছরের শাসন নিয়ে জনমানুষের ক্ষোভ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাদের বলেন, “সাড়ে ১৫ বছরে পদ্মা সেতু করেছি, মেট্রোরেল করেছি, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করেছি।” সাংবাদিক পাল্টা প্রশ্ন করেন—২০১৮ সালে রাতের ভোট, ২০২৪ সালের ‘ডামি নির্বাচন’—এসব কি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল না? কাদের বলেন,“এসব আলোচনার বিষয়। আমাদেরও দৃষ্টিভঙ্গি আছে। পৃথিবীর সব দেশে গণতন্ত্র একরকম নয়। আমাদের বিরোধীদের চরিত্র বিবেচনায় নির্বাচনকে আইনি কাঠামোয় করেছি।”

এরপর প্রশ্ন আসে—শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াকে কি রাজনীতির জন্য লজ্জাজনক নয়? কাদের বলেন, “না, আমি মনে করি না। তাকে বাঁচার প্রয়োজন ছিল। পরিকল্পনা ছিল তাকে হত্যা করার।”

সাংবাদিক তখন বলেন, খালেদা জিয়াও তো অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু দেশ ছাড়েননি। কাদের উত্তর দেন, “তিনি কম্প্রোমাইজ করেননি, কিন্তু শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা দরকার ছিল।”

আলোচনায় বারবার ফিরে আসে জনমতের প্রসঙ্গ। কাদের দাবি করেন, “এখন দেশের বেশিরভাগ মানুষ শেখ হাসিনাকেই চায়। অপিনিয়ন পোল নেন, দেখবেন।”

নাজমুস সাকিব যখন বলেন, “আপনারা এত জনসমর্থন দাবি করছেন, অথচ দেশে ফিরে আসছেন না।”উত্তরে কাদের বলেন, “সময় হলে দেখবেন।” আরও বলেন, “দি সান রাইজেস এন্ড ডিনাইজ বিফোর… আপনি এর বাংলা ভাবুন। উই ক্যান গেট আউট অব দিস গ্যাটার।”

সাংবাদিক জানতে চান, আপনারা এই অবস্থায় পড়লেন কেন? কাদের বলেন, “অনেকেই এখন মনে করছে, তারা ভুল করেছে। এমনকি আন্দোলনে জঙ্গি উত্থানের যারা অংশ নিয়েছিল তারাও।”

কাদের আরও বলেন, “আপনারা দেখবেন, আমরা দেশে ফিরলে আপনাদের অনেককে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।” সাকিব পাল্টা বলেন, “মানে আপনারা আবার প্রতিহিংসার রাজনীতি করবেন?” কাদের বলেন, “আমরা না, আপনি নিজেই পালাবেন।”

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে সাংবাদিকতা ও পক্ষপাতের প্রশ্নে দুজনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। কাদের বলেন, “আপনি বায়াসড, পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিক।” সাকিব পাল্টা বলেন, “বায়াসড হলে নাঈমুল ইসলাম খানের মতো লোকরাও তো বায়াসড ছিলেন, তিনি শেখ হাসিনার পক্ষে কথা বলতেন।”

কাদের বলেন, “আপনি একটি রাজনৈতিক ক্যাম্পের পক্ষে কথা বলছেন। আপনি সাংবাদিক না, আপনি পক্ষ হয়ে কথা বলছেন। আর আমাদের দল এখন নিষিদ্ধ, আপনারা তো এই সাক্ষাৎকার প্রচারই করতে পারবেন না।”

সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষদিকে নাজমুস সাকিব জানতে চান, “আপনারা কি আপনাদের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাইবেন না?” কাদের বলেন, “আমরা যদি করি, দেশে ফিরে করবো। বিদেশে বসে নয়।”

জবাবে সাকিব বলেন, “আমরাও তাহলে অপেক্ষায় থাকলাম, আপনারা কবে দেশে ফিরবেন।” কাদের পাল্টা বলেন, “তখন আপনাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

সাক্ষাৎকারটি এর পরেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে শেষ হয়।

মতামত দিন