দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে তৈরি পোশাকশিল্প।
দেশের যেকোনো ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। এমন একটি পরিকল্পনা দেশি শিল্পের বিকাশে সহায়ক হবে, তৈরি করবে নতুন কর্মসংস্থান, বাড়াবে বৈদেশিক বাণিজ্য, এবং সামগ্রিকভাবে এগিয়ে নেবে দেশকে।
সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ১৫ এপ্রিল ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিষেধাজ্ঞা। যদিও সমুদ্রপথে আমদানি চালু আছে, তাতে সময় বেশি লাগে। এর আগে ৮ এপ্রিল ভারতের কেন্দ্রীয় শুল্ক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের পণ্য ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধাও প্রত্যাহার করে নেয়।
বাংলাদেশে তুলা উৎপাদন না-থাকায় বিদেশ থেকেই তা আমদানি করতে হয়। ভারত থেকেও তুলা ও সুতা আমদানি হয়, কারণ ভারতীয় সুতার দাম তুলনায় কম — প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৩০ সেন্ট পর্যন্ত। দেশের স্পিনিং মিলগুলো সুতা উৎপাদনে সক্ষম হলেও বেশি দাম ও গ্যাস-সংকটের কারণে তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খায়। অতীতে নগদ সহায়তা কিছুটা ভারসাম্য এনে দিলেও তা দুই দফায় কমানোয় ভারতীয় সুতার প্রতি ঝুঁকেছে পোশাকশিল্প।
ভারতীয় সুতা আমদানির প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।আমদানি ঘোষণার চেয়ে বেশি পরিমাণে সুতা দেশে প্রবেশ, সস্তা দামে উচ্চ কাউন্টের সুতা আনার মতো অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কাস্টমসের পর্যাপ্ত জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না-থাকায় এগুলোর নজরদারি দুর্বল। এ অবস্থায় সরকার হঠাৎ করে আমদানি বন্ধ না করে বরং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে জোরালো পদক্ষেপ নিলে ভালো হতো।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন স্পষ্ট করেছে, অনিয়ম ঠেকাতে তারা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি কিনে দিতে প্রস্তুত। তাদের মূল লক্ষ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা।কারণ, বিশ্ববাজারে এক-দুই সেন্টের ব্যবধানে ক্রয়াদেশ হারানোর বাস্তবতা এখানে কাজ করে।
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে কি দেশি মিলের সুতা ব্যবহার করব না? অবশ্যই করব, তবে সেটি প্রতিযোগিতামূলক দামে হতে হবে। কিন্তু সুতা আমদানিতে বাধা দেওয়ার পর দেশি মিলগুলোই উল্টো দাম বাড়িয়েছে। কোনো নিয়ন্ত্রণ সংস্থা না থাকায় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, বাধ্য হচ্ছেন বেশি দামে সুতা কিনতে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের আসল সুতা চাহিদা ও জোগানের বাস্তবচিত্র কী? বিশ্বাসযোগ্যভাবে এই চিত্র স্পষ্ট না করে আমদানিতে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া নীতিগত ভুল।
স্পিনিং মিল মালিকেরা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস–সংকটে ভোগার কথা বলে আসছেন। অতিরিক্ত দাম দিয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না তাঁরা। শুল্ক, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারসহ নানা কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে সরকারকে দেশি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। গ্যাস সংকটের মতো মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে হঠাৎ করে সুতার আমদানি প্রক্রিয়া বন্ধ করা হলে তা দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
গত কয়েক বছরে করোনা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, মার্কিন শুল্কবৃদ্ধিসহ নানা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। ভবিষ্যতেও সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কাঁচামালের সংযোগ শিল্পে দুর্বলতা থেকেই যাচ্ছে। এই দুর্বলতাকে কাটিয়ে না উঠলে শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
অতএব, আমরা যদি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে টিকে থাকতে চাই, তাহলে প্রতিযোগিতার মধ্যেই নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। কৃত্রিমভাবে কিছু আটকে রাখা নয়, বরং সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, আমরা কেউই চায় না দেশের বিজয়কে সংকুচিত করে একটি খাতকে কৃত্রিমভাবে রক্ষা করতে। আমরা চাই, প্রতিযোগিতামূলক দেশি শিল্প হোক, এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হোক।

মতামত দিন