পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের অজুহাতে শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধায় বিদেশ থেকে কাগজ আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করছে একাধিক অসাধু চক্র। এতে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে দেশের কাগজশিল্প-যেখানে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন প্রায় ২৫ লাখ মানুষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল আরও এক কোটি।
বাংলাদেশ পেপার মিল অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ) জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী ছাপার কাগজ আমদানির সুযোগ নিয়ে একটি চক্র নিয়মবহির্ভূতভাবে আমদানি করা কাগজ বাজারে বিক্রি করছে।এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে তারা এ অনিয়ম তুলে ধরে দ্রুত শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, ‘ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং এক প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি মিলে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের জন্য সাত হাজার ৭৫০ মেট্রিক টন ছাপার কাগজ আমদানি করে তা মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ না করে বেশি দামে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেছে। শুধু তাই নয়, কাগজ আমদানির প্রকৃত পরিমাণ নথিপত্রে উল্লেখিত সংখ্যার চেয়েও বেশি বলে অভিযোগ করা হয়।
বিপিএমএর ভাষ্য,এই ধরনের কর্মকাণ্ড একদিকে শুল্কমুক্ত আমদানির শর্ত লঙ্ঘন করেছে,অন্যদিকে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি করেছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, শিগগির এই অপচেষ্টা বন্ধ না করা গেলে ভবিষ্যতে আরও অনেকেই এমন অনৈতিক পথে হাঁটবে।
বিপিএমএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১২৮টি নিবন্ধিত কাগজকলের মধ্যে বর্তমানে ১০৬টি চালু রয়েছে,যেগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৯ লাখ মেট্রিক টন দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বাকি অংশ ৪০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হয়। এতে প্রতিবছর দেশে আসে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এই খাতে এক লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে এবং প্রতিবছর সরকার পাচ্ছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। কিন্তু বর্তমানে অনিয়ম ও চোরাচালানের কারণে এই শিল্প ধ্বংসের মুখে।
সংগঠনটি অভিযোগ করে বলেছে, বন্ড সুবিধা, মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কিছু অসাধু চক্র কাগজ আমদানি করছে, যার ফলে এরই মধ্যে ৮০টি কাগজকল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।বাকি ২৬টি মিল টিকে থাকার লড়াইয়ে ধুঁকছে।
প্রসঙ্গত,২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের জন্য এনসিটিবির নির্ধারিত স্পেসিফিকেশনের কাগজ সময়মতো ও সঠিক মূল্যে সরবরাহে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল দেশীয় মিলগুলো। গত ২০ বছর ধরে এনসিটিবিতে কাগজ সরবরাহের অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। কিন্তু এনসিটিবির কার্যাদেশ পাওয়া কিছু মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান দেশীয় কাগজ না কিনে শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ নিচ্ছে, যা দেশীয় শিল্পের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
বিপিএমএর মতে, দেশীয় মিলগুলো এনসিটিবিতে কাগজ সরবরাহের সময় ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর পরিশোধ করে, অথচ আমদানিকৃত কাগজে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকায় সেখানেও এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানায়, শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) মওকুফে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ায় সরকারের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা জরিমানাসহ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছাপার কাগজ আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক ও ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক শর্তসাপেক্ষে মওকুফ করে এনবিআর। তবে বাস্তবে অনেক আমদানিকারক সেই শর্ত মানছে না। বিপিএমএর দাবি, এই অযৌক্তিক সুবিধা অব্যাহত থাকলে দেশীয় কাগজশিল্পের ধ্বংস অনিবার্য।
অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই শিল্পকে বাঁচাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিলসহ কঠোর নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পেপার মিল অ্যাসোসিয়েশন।
মতামত দিন