রওশন জামিল চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চের বহুমাত্রিক অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী।
রওশন জামিল (৮ মে ১৯৩১ ~ ১৪ মে ২০০২)
রওশন জামিল ১৯৩১ সালের ৮ মে ঢাকার রোকনপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় লক্ষ্মীবাজারের সেন্ট ফ্রান্সিস মিশনারি স্কুলে; পরে তিনি পড়াশোনা করেন ইডেন কলেজে।
শৈশবেই নৃত্যের প্রতি গভীর আগ্রহ থেকে নৃত্যানুশীলন শুরু করেন। ম্যাট্রিক পাসের পর ওয়ারী শিল্পকলা ভবনে প্রাতিষ্ঠানিক নাচের প্রশিক্ষণ গ্রহণকালে প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী গওহর জামিলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, যা পরিণয়ে গড়ায় ১৯৫২ সালে। গওহর জামিল তাঁর নৃত্যগুরু হলেও রওশন জামিল নিজেও শিল্পী হিসেবে দ্রুত খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৫৯ সালে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন ‘জাগো আর্ট সেন্টার’—নৃত্য প্রশিক্ষণের অন্যতম পুরোধা প্রতিষ্ঠান। স্বামীর মৃত্যুর পর রওশন এই কেন্দ্রের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
অভিনয়জগতে রওশন জামিলের যাত্রা শুরু ১৯৬৫ সালে, বিটিভির ‘রক্ত দিয়ে লেখা’ নাটকের মাধ্যমে। পরে ‘ঢাকায় থাকি’, ‘সকাল সন্ধ্যা’সহ অনেক নাটকে তাঁর অভিনয় তাঁকে স্মরণীয় করে তোলে। চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক ১৯৬৭ সালে ‘আলিবাবা’ ছবির মাধ্যমে। বাস্তবধর্মী অভিনয়ের জন্য তিনি দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
তিনি অভিনয় করেছেন বহু চলচ্চিত্রে—এর মধ্যে রয়েছে জীবন থেকে নেয়া,তিতাস একটি নদীর নাম,গোলাপী এখন ট্রেনে, সূর্য সংগ্রাম, ওরা ১১ জন, মাটির ঘর, সূর্য দীঘল বাড়ী, দেবদাস, নয়নমণি, দহন, নদের চাঁদ, মাটির কোলে, বাঁধনহারা, লালসালু ইত্যাদি। তাঁর অভিনীত কিছু চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন জহির রায়হান, ঋত্বিক ঘটক, শেখ নিয়ামত আলী ও আমজাদ হোসেনের মতো গুণী নির্মাতারা।
রওশন জামিল ছিলেন একাধারে নাট্যশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী এবং বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল। উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৫২ সালের দিকে যখন ছেলেদেরই নারী চরিত্রে অভিনয় করতে হতো, সেই সময় তিনি জগন্নাথ কলেজে মঞ্চস্থ শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ নাটকে অভিনয় করেন।
অভিনেত্রী হিসেবে তিনি কোমল, দৃঢ় ও ব্যতিক্রমধর্মী সব ধরনের চরিত্রে ছিলেন সমান সাবলীল। অভিনয়ে তিনি নিজস্ব একটি স্টাইল নির্মাণ করেছিলেন।তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশে পদক (নৃত্যে, ১৯৯৫), টেনাশিনাস, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড, বাচসাস ও তারকালোকসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।
২০০২ সালের ১৪ মে, দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই মহীয়সী শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে।
মতামত দিন