বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
ছবি: সংগৃহীত

মহাবিশ্বে জীবনের সূত্র খোঁজায় বড় অগ্রগতি, সালফারযুক্ত সবচেয়ে বড় জৈব অণুর সন্ধান।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

মহাকাশে জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বোঝার পথে গুরুত্বপূর্ণ এক আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা প্রথমবারের মতো সালফারসমৃদ্ধ সবচেয়ে বড় জৈব অণুর অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন, যা নক্ষত্রজন্মের পরিবেশে গঠিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, এই অণু মহাজাগতিক রসায়ন ও পৃথিবীতে জীবনের সূচনার মধ্যে একটি অনুপস্থিত সংযোগ ব্যাখ্যা করতে পারে।

নতুন আবিষ্কৃত অণুটির নাম 2,5-সাইক্লোহেক্সাডায়াইন-1-থায়ন। এতে রয়েছে মোট ১৩টি পরমাণু। এর আগে মহাকাশে শনাক্ত হওয়া সালফারযুক্ত জৈব অণুগুলোর সর্বোচ্চ আকার ছিল ৯টি পরমাণু পর্যন্ত সীমিত। ফলে এটিকে এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় সালফারধারী অণু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সালফার মহাবিশ্বের অন্যতম প্রচুর উপাদান হলেও মহাকাশের গ্যাস ও ধুলোর মেঘে এর জটিল জৈব রূপ দীর্ঘদিন রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। অথচ পৃথিবীর জীবজগতে সালফার অ্যামিনো অ্যাসিড, প্রোটিন ও এনজাইমের অপরিহার্য অংশ। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্সের গবেষক মিতসুনোরি আরাকি বলেন, মহাকাশে সালফার থাকার কথা থাকলেও বড় আকারের অণু খুব কমই ধরা পড়েছে, যা বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে।

এই অণুর সন্ধান মিলেছে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত G+0.693–0.027 নামের একটি অণুমেঘে। পৃথিবী থেকে প্রায় ২৭ হাজার আলোকবর্ষ দূরে থাকা এই অঞ্চলটি ঠান্ডা ও ঘন গ্যাস-ধুলার স্তরে ভরা, যেখানে নতুন নক্ষত্রের জন্ম হয়।

গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা প্রথমে পরীক্ষাগারে সালফারযুক্ত একটি অণু তৈরি করেন এবং সেটির রেডিও সিগন্যাল মহাকাশ থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে তুলনা করেন। শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপের সাহায্যে মিল খুঁজে পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যায়, একই ধরনের অণু ওই অণুমেঘে বিদ্যমান।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, এমন জটিল অণুগুলো ধুমকেতু ও উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে একসময় পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে পারে। এতে করে পৃথিবীতে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান সরবরাহের একটি সম্ভাব্য পথ ব্যাখ্যা করা যায়।

পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক কেট ফ্রিম্যান এই আবিষ্কারকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি ‘গোয়েন্দা সাফল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, উন্নত প্রযুক্তি ও সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধান কৌশল ছাড়া এমন আবিষ্কার সম্ভব হতো না।

লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বিজ্ঞানী সারা রাসেল বলেন, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে এত জটিল অণুর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে জীবনের উপাদান শুধু পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্য গ্রহেও জীবনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে মিসিসিপি ইউনিভার্সিটির রায়ান ফোর্টেনবেরির মতে, সালফারের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য একে আরও জটিল বিক্রিয়ার উপযোগী করে তোলে, যা অক্সিজেন বা নাইট্রোজেনের তুলনায় ভিন্ন মাত্রার অণু গঠনে সহায়তা করে।

এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের আগের ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করছে—মহাকাশে বড় অণু নাকি সহজেই ভেঙে যায়। গবেষকদের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে আরও বড় ও জটিল অণুর সন্ধান পাওয়া গেলে মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাব্য উৎপত্তি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

সূত্র: সিএনএন

মতামত দিন