বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
ছবি: সংগৃহীত

স্টারলিংক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি জোট সরকার আর বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার – দুই দেশের রাজনৈতিক পথ যত আলাদা হোক না কেন, একটি বিষয়ে দুই পক্ষই চমৎকারভাবে একমত: ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংস্থা ‘স্টারলিংক’কে নিজেদের দেশে নিয়ে আসা।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরাসরি দেখা করেন ইলন মাস্কের সঙ্গে।

তার ঠিক একই দিনে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও মাস্কের সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপ করেন এবং বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। এমনকি মাত্র ৯০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশে স্টারলিংকের পরিষেবা চালুর সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ইতোমধ্যে স্টারলিংকের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে সম্ভাব্য অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত চাহিদা যাচাই করে গেছে। অন্যদিকে, ভারতে এয়ারটেল ও রিলায়েন্স জিও – দেশটির দুই বৃহৎ টেলিকম সংস্থা – প্রায় একই সময়ে স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ঘোষণা দিয়েছে। যদিও এই সমঝোতা বাস্তবায়ন নির্ভর করছে ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার অনুমোদনের ওপর।

এদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় স্টারলিংকের পদার্পণ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ২০২৪ সালের শেষেই ভুটানে চালু হয়েছে এই পরিষেবা, যার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ফলে ভারত বা বাংলাদেশ – কোন দেশ স্টারলিংককে আগে স্বাগত জানায় তা শুধু প্রতিযোগিতার প্রশ্ন নয়, বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারেরও প্রতিফলন।

স্টারলিংকের প্রযুক্তিগত প্রভাব

স্টারলিংক একটি স্যাটেলাইট-নির্ভর ইন্টারনেট পরিষেবা, যা পরিচালনা করে স্পেসএক্স। বর্তমানে পৃথিবীর চারপাশে সাত হাজারেরও বেশি ‘লো-আর্থ অরবিট’ স্যাটেলাইট ব্যবহার করে এটি ব্রডব্যান্ড সংযোগ সরবরাহ করছে। এই পরিষেবা ভূগর্ভস্থ কেবল বা মোবাইল টাওয়ারের ওপর নির্ভর না করেই সরাসরি ‘ইউজার টার্মিনালের’ মাধ্যমে কাজ করে, ফলে দুর্গম এলাকা বা অনুন্নত অঞ্চলেও সহজে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া সম্ভব।

ভারতের মতো একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডে এই পরিষেবা গ্রামীণ কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির জন্য বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এয়ারটেল জানায়, তাদের বিপুল খুচরা স্টোর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই স্টারলিংকের ডিভাইস বিপণন সহজ হবে, ফলে প্রাথমিক লগ্নির পরিমাণও কমে আসবে।

তবে শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধাই নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশ।

রাজনৈতিক পটভূমি ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ

বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস প্রকাশ্যে স্টারলিংকের সঙ্গে যোগাযোগকে শুধুই ব্যবসায়িক বলে বর্ণনা করলেও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এতে রয়েছে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কূটনৈতিক ইঙ্গিতও। একইভাবে, ভারতের পক্ষ থেকেও স্টারলিংকের উপস্থিতি দেশটির আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়ানোর অংশ হতে পারে।

তবে প্রশ্ন রয়ে যায় – এই পরিষেবা কি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে, নাকি শুধুই কর্পোরেট ও উচ্চবিত্তের দখলে যাবে? এবং এর নিরাপত্তাগত ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত এই দুই দেশ?

যে দিকেই মোড় ঘুরুক না কেন, ভারত ও বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোয় স্টারলিংকের আগমন নিঃসন্দেহে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে – প্রযুক্তি, কূটনীতি ও জাতীয় স্বার্থের ত্রিমাত্রিক ছায়ায়।

মতামত দিন