সমুদ্রে রহস্যময় ঢেউ: ভয়ঙ্কর শক্তি যা জাহাজও সহজে থামাতে পারে না।
১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বর উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে নিখোঁজ হয়েছিল ৮৫০ ফুট দীর্ঘ কার্গো জাহাজ এম এস মুনচেন। নিখোঁজ হওয়ার আগে জাহাজটি থেকে বিপৎসংকেত পাঠানো হয়েছিল।
এরপর ১৯৮০ সালে ৯৬৪ ফুট দীর্ঘ ব্রিটিশ কার্গো জাহাজ এমভি ডার্বিশায়ার দক্ষিণ চীন সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে মাত্র দুই মিনিটে ডুবে যায়। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ডুবে যাওয়া সবচেয়ে বড় জাহাজ হিসেবে ধরা হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, উভয় জাহাজই বিশেষ ধরনের ঢেউয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এই রহস্যময় ঢেউ পার্শ্ববর্তী ঢেউয়ের তুলনায় অন্তত দুই গুণ বড়, উঁচু চূড়া ও গভীর ঢাল তৈরি করে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রে চারপাশ থেকে আসা ঢেউ বিভিন্ন গতিতে মিলিত হয়ে বিশাল প্রাচীর তৈরি করে। এছাড়া ছোট ছোট ঢেউ তাদের শক্তি একত্রিত করে একটি বড় ঢেউ তৈরি করে। বাতাস এই ধরনের ঢেউ তৈরিতে মূল ভূমিকা রাখে। বাতাসের শক্তি যত বেশি, সমুদ্র তত বেশি বিক্ষুব্ধ হয়।
১৯৯০-এর দশকের পর জাহাজের নকশা উন্নত হলেও এ ধরনের ঢেউ এখনো হুমকিস্বরূপ। বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও খতিয়ে দেখছেন। জাপানের ওকিনাওয়া ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মেরিন ফিজিকস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান আমিন চাবচৌব বলেন, “গ্লোবাল উষ্ণায়নের কারণে বাতাসের গতি বেড়েছে। যেহেতু বাতাস ঢেউ তৈরি করে, তাই জলবায়ু পরিবর্তন ও ভয়ঙ্কর ঢেউয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকতে পারে।”
২০১৯ সালে ব্রিটিশ এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে এমন ঢেউয়ের উচ্চতা বছরে ১ শতাংশ হারে বেড়ে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলেসান্দ্রো তোফোনি ২০১৭ সালে দক্ষিণ মহাসাগরে প্রতি ছয় ঘণ্টায় এই ধরনের ঢেউ তৈরি হতে দেখেছেন। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার অব ওশান ইনফরমেশন সার্ভিসেস ২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ৫৫টি এ ধরনের ঢেউ শনাক্ত করেছে।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এই রহস্যময় ঢেউ শনাক্তের চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের গবেষকরা গত বছর একটি এআই টুল চালু করেছেন, যা ঢেউ আসার ৫ মিনিট আগে সতর্ক করতে পারে। জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ফ্রান্সেসকো ফেডেলে বলছেন, “এআই দুষ্টু ঢেউয়ের পূর্বাভাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।”
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
মতামত দিন