ভাসমান সোলার সিস্টেমে জার্মানির বড় সম্ভাবনা গবেষকদের।
ভূমিতে নয়, পানির উপর ভেসে থাকা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র—জার্মানিতে ‘ফ্লোটিং সোলার সিস্টেম’ এখন ক্রমেই সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। তবে এর সঙ্গে রয়েছে পরিবেশগত কিছু প্রশ্ন, যার উত্তর খুঁজছে দেশটির গবেষকেরা।
ভাসমান সৌর প্যানেল স্থাপন খরচ সাপেক্ষ হলেও, পানির শীতল পরিবেশে তা বেশি কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। জার্মানিতে প্রথম এ ধরনের প্রকল্প চালু হয় ২০১৯ সালে, সাবেক এক খনি এলাকায়। দেশটির পূর্বাঞ্চলের আরেকটি পরিত্যক্ত খনি অঞ্চলে এখন গড়ে উঠছে সবচেয়ে বড় ভাসমান সোলার প্ল্যান্ট—যার আয়তন ২০টি ফুটবল মাঠের সমান। এই কেন্দ্র থেকে প্রায় আট হাজার পরিবার বিদ্যুৎ পায়।
জার্মানির হোলমানস নুড়িপাথর কারখানা প্রথমদিকেই এ প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে। সেখানে ৩.৩ হেক্টর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সৌর প্যানেলগুলো থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, তা দিয়েই চলে কারখানার অধিকাংশ কাজ। প্রতিষ্ঠানটির এক পরিচালক ইয়ুর্গেন ফ্র্যোলিশ জানান, “আমাদের প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নিজেরাই উৎপাদন করি। যখন পর্যাপ্ত সূর্য থাকে না, তখন গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হয়। আবার ছুটির দিনে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ফের গ্রিডে দিয়ে দিতে হয়, কিন্তু তা আমাদের জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক নয়।”
এমন বাস্তবতায় তারা এখন বিদ্যুৎ সংরক্ষণের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের কথা ভাবছে। তিনি আরও জানান, সরকার থেকে কোনো ভর্তুকি ছাড়াই এই প্রকল্পে কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নে পাঁচ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করা হয়েছে। অনুমোদনের জটিলতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে লেগেছে প্রায় দুই বছর।
ভাসমান সোলার প্যানেলের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে দেশটির ফ্রাউনহফার ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানের গবেষক কারোলিন বালটিনস বলেন, “অনেক কর্তৃপক্ষই জানে না, কীভাবে এই প্রযুক্তির প্রশাসনিক দিক সামলাতে হবে। এখন পর্যন্ত কেবল কৃত্রিম হ্রদে এর অনুমতি রয়েছে এবং সেখানে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ জায়গা দখল করা যায়।”
তিনি উদাহরণ দেন নেদারল্যান্ডসের, যেখানে এমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। সেখানে কিছু হ্রদে ৭০ শতাংশ এলাকা পর্যন্ত সোলার প্যানেল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
তবে এই প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও রয়েছে সতর্কতা। জার্মানির কেন্দ্রীয় পরিবেশ সংস্থার উলরিকে ভ্যুরফ্লাইন বলেন, পানির মধ্যে অক্সিজেনের ঘাটতি হলে শৈবাল ও ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের মৃত্যু হতে পারে,যা মাছের খাদ্যশৃঙ্খল এবং বাস্তুতন্ত্রে বড় ধাক্কা আনবে।
হোলমানস প্রকল্পের অনুমোদনের একটি শর্ত ছিল, হ্রদের পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়মিত নথিভুক্ত করা।এজন্য তারা একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়েছে, যারা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, জলজ উদ্ভিদ, তলদেশের শৈবাল,মাছ ও পাখির ওপর নজর রাখছে। পুরো তথ্য পাঁচ বছর ধরে সংরক্ষণ করতে হবে।
ভাসমান সৌর প্যানেল সাধারণত ২০ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম। ভবিষ্যতে একে বায়ু ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে একত্রে ব্যবহার করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এমনকি সমুদ্রেও এই প্রযুক্তি প্রয়োগের কথা ভাবা হচ্ছে। তবে সেক্ষেত্রে সিস্টেমকে লবণ পানি, ঢেউ ও ঝোড়ো বাতাস সহ্য করার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

মতামত দিন