বাংলাদেশকে তাদের নির্ধারিত ম্যাচগুলো ভারতের মাটিতেই খেলতে হবে: আইসিসি।
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে—বাংলাদেশকে তাদের নির্ধারিত ম্যাচগুলো ভারতের মাটিতেই খেলতে হবে।
আইসিসির এই অবস্থানের ফলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখন কার্যত সময়সীমার ওপর ঝুলছে। বোর্ড সভা শেষে বিসিবিকে জানানো হয়েছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিজেদের চূড়ান্ত অবস্থান জানাতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্মতি না দিলে গ্রুপ ‘সি’-তে অন্য কোনো দলকে অন্তর্ভুক্ত করার পথেই হাঁটবে আইসিসি।
এই সিদ্ধান্তের পরপরই বুধবার গভীর রাতে ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা। রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলা সেই বৈঠকে সরকারের অবস্থান, কূটনৈতিক দিক এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব—সব কিছু নিয়েই আলোচনা চলছিল।
বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বাংলাদেশের ক্রিকেট যে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক করছেন দেশের একাধিক সাবেক ক্রিকেটার ও প্রশাসক। তাদের মতে, শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়—এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক সূচি, দ্বিপক্ষীয় সিরিজ এবং বোর্ডগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও।
এর আগে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা তুলে ধরে ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিসিবি। সমাধানের পথ খুঁজতে আইসিসি ও বিসিবির মধ্যে একাধিক দফা যোগাযোগ হয়। এমনকি বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে রাজি করাতে ঢাকায় এসে আলোচনায় বসেন আইসিসির কর্মকর্তারা। তবে সেই প্রচেষ্টায় অবস্থান বদলায়নি বিসিবি।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আইসিসি বোর্ড সভায় তোলা হয়, যেখানে পূর্ণ সদস্য ১২ দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ভোটাভুটির মাধ্যমে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের দাবির পক্ষে কোনো দেশ দাঁড়ায়নি। সহযোগী সদস্য দেশগুলোর অবস্থানও ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে। এমনকি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হলেও সেটির কোনো প্রভাব পড়েনি।
আইসিসির ওই সভার পর প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব পর্যালোচনা করতেই জরুরি বোর্ড সভা ডাকা হয়েছিল। আলোচনায় স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন, আয়োজক দেশের নিশ্চয়তা এবং ভেন্যুভিত্তিক পরিকল্পনা বিশদভাবে খতিয়ে দেখা হয়। মূল্যায়নের সারসংক্ষেপে আইসিসির সিদ্ধান্ত—ভারতের কোনো ভেন্যুতেই বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, গণমাধ্যম কিংবা সমর্থকদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই।
আইসিসির এক মুখপাত্র সভা শেষে বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিসিবির সঙ্গে নিয়মিত ও গঠনমূলক আলোচনা চালানো হয়েছে, যাতে বাংলাদেশ অংশ নিতে পারে। স্বাধীন নিরাপত্তা রিপোর্ট ও আয়োজকদের নিশ্চয়তা সত্ত্বেও কোনো বিশ্বাসযোগ্য হুমকির প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে একই সঙ্গে বিসিবির অবস্থান নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করেন ওই মুখপাত্র। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যা একজন খেলোয়াড়ের ভারতের ঘরোয়া লিগে অংশগ্রহণসংক্রান্ত। আইসিসির মতে, এই ঘটনার সঙ্গে বিশ্বকাপের নিরাপত্তা কাঠামোর কোনো সম্পর্ক নেই।
বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত অংশ না নিলে বিকল্প দল হিসেবে ইউরোপিয়ান বাছাইয়ে বাদ পড়া স্কটল্যান্ডের নাম আলোচনায় এসেছে। যদিও এ বিষয়ে আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
বিশ্বকাপের বাইরে থাকলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কূটনৈতিক ও ক্রীড়াগত ধাক্কাও আসতে পারে বাংলাদেশের জন্য। টুর্নামেন্টের রাজস্ব বণ্টন থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি, যেসব বোর্ড ভোটে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়নি, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরে ভারতের বাংলাদেশ সফর বাতিল হওয়ার সম্ভাবনাও জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
সব মিলিয়ে আইসিসির কড়াকড়ি অবস্থানের মুখে এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে। সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—বিশ্বকাপের মঞ্চে থাকবে কি না বাংলাদেশ।
মতামত দিন