কোটি টাকার সুগন্ধি গাছ: আগরের রাজ্যে রাঙামাটি।
গাছের কাণ্ড ও শিকড় ভেদ করে ঢুকে পড়ে এক প্রজাতির বিটল পোকা। এই পোকার আক্রমণে ক্ষত সারাতে গাছটি তৈরি করে এক ধরনের রজন—যেটি দেখতে অনেকটা মানুষের শরীরের ক্ষতে জমে ওঠা লালচে শক্ত আবরণের মতো।
সুগন্ধির জন্য আরাধ্য এই আগরগাছে যত বেশি পোকা বা ছত্রাকের আক্রমণ হয়, ততই কাঠ হয়ে ওঠে কালচে, ঘন এবং সুগন্ধিতে ভরা। প্রাকৃতিকভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে ১৫–২০ বছর। তবে বাণিজ্যিকভাবে আগরের সুগন্ধি উৎপাদনে গাছের কাণ্ডে পেরেক ঢুকিয়ে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয় ক্ষত,যাতে ছত্রাকের আক্রমণে জমে রজন। আর এই প্রক্রিয়ায় গাছের দাম বাড়তে থাকে আকাশচুম্বী হারে।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার উগলছড়ি গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অনন্ত সিং চাকমা একটি বড় আগরগাছ ৬ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। তিনটি আগরগাছ ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন খেদারমারা ইউনিয়নের ঢেবাছড়ি গ্রামের চাষি আলোময় চাকমা। এছাড়া তালুকদার পাড়া ও তুলাবান গ্রামে স্থাপিত চুল্লিতে এই কাঠ থেকে সুগন্ধি উৎপাদন হচ্ছে, যা রপ্তানি হচ্ছে সৌদি আরব, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
বিশ্ববাজারমুখী আগর শিল্প
ব্যবসায়ী জয়তী চাকমা জানান, আগরের আতরের বিপুল চাহিদা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘাইছড়ির বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া প্রাকৃতিক আগরগাছ থেকেই সবচেয়ে উন্নতমানের সুগন্ধি সংগ্রহ করা হয়।তবে এখনো বেশিরভাগ বেচাকেনা হচ্ছে ব্যক্তি উদ্যোগে, সংগঠিত কোনো কাঠামো ছাড়া। ২০২৩ সালে একটি সমিতি গঠন করা হলেও এখনো সেটি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াধীন।
আগরগাছ থেকে তিনভাবে সুগন্ধি পাওয়া যায়:
১. প্রাকৃতিক পোকার আক্রমণে
২. কৃত্রিমভাবে পেরেক ঢুকিয়ে
৩. কাঠের নির্যাস থেকে
প্রাকৃতিক সুগন্ধিযুক্ত গাছ পাওয়া যায় বাঘাইছড়ি উপজেলার উগলছড়ি, তালুকদার পাড়া, তুলাবান, শিজক, মহিষপয্যা, শিলকাটাছড়া, ঢেবাছড়ি ও নলবনিয়া এলাকায়। পেরেক দেওয়া সুগন্ধির তুলনায় প্রাকৃতিক সুগন্ধির মান ও দাম বেশি। পেরেক পদ্ধতিতে উৎপাদিত সুগন্ধির প্রতি তোলা বিক্রি হয় ছয় হাজার টাকায়। আর নির্যাস থেকে তৈরি সুগন্ধির মান তুলনামূলক কম।
চুল্লিতে তৈরি হয় কোটি টাকার আতর
২০১২ সালে তালুকদার পাড়া ও তুলাবান গ্রামে স্থাপন করা হয় দুটি চুল্লি।প্রতিটি চুল্লি বছরে অন্তত তিন কোটি টাকার আতর উৎপাদনের সক্ষমতা রাখলেও কাঁচামালের ঘাটতির কারণে তা ৮–৯ মাসের বেশি চলে না। বর্তমানে দুই চুল্লি থেকে প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি টাকার আতর বিক্রি হয়।
প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ। কাটা আগরগাছ পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরে চুল্লিতে সেদ্ধ করা হয়। ভাপে ওঠা তেল সংগ্রহ করা হয় একটি আলাদা পাত্রে। এসব আতর বোতলজাত করে রপ্তানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। সিলেটের আগর ব্যবসায়ী মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় আমরা খুব অল্প পরিমাণ সুগন্ধি রপ্তানি করতে পারছি।’
সরকারি উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশক থেকে বাঘাইছড়ি এলাকায় আগর চাষ শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে কাচালং আর্যপুর বনবিহারে ৩,৫০০ আগরগাছ রোপণ করা হয়। ২০১৭ সালে এসব গাছের মধ্যে থেকে ৩০০ গাছ ১৯ হাজার টাকা দরে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে বাঘাইছড়িতে ব্যক্তিমালিকানাধীন অন্তত ১৫ লাখ আগরগাছ রয়েছে।
রাঙামাটি সার্কেলের দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ২০০৯ সালে বন বিভাগ ৫০০ একর জমিতে আগর রোপণ করেছে।তবে এখনো সেই গাছগুলো সুগন্ধিযুক্ত হয়েছে কি না,তা মূল্যায়ন করা হয়নি। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পার্বত্য চট্টগ্রামের আগরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

মতামত দিন