কৃষি ও কৃষক
ছবি: সংগৃহীত

নওগাঁয় বাড়ছে নাবি জাতের আম চাষ, ফলন ও দামে লাভবান কৃষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নওগাঁসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে দিন দিন বাড়ছে নাবি (বিলম্বে ফলনশীল) জাতের আম চাষ। ফলন বেশি, দাম বেশি এবং মৌসুম শেষে বাজারে সরবরাহের কারণে এসব আম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন কৃষকরা।

এতে করে শুধু লাভের অঙ্কই বাড়ছে না, বরং দেশের আমের বাজারেও সময়সীমা দীর্ঘ হচ্ছে।

দেশে সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের প্রথম ভাগ পর্যন্ত আমের মৌসুম ধরা হয়। গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, নাকফজলি ও হাঁড়িভাঙার মতো জাতগুলো তখনই বাজারে আসে। ফলে বেশি সরবরাহের কারণে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত দাম পান না চাষিরা।

তবে এ সময়ের পর যখন অন্যান্য জাতের আম বাজার থেকে কমে আসে, তখনই পাকতে শুরু করে বারি আম-৪, গৌড়মতি (বারি-১২) ও আশ্বিনার মতো নাবি জাতের আম। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত বাজারে থাকে এই আম, এবং তখন দাম থাকে তুলনামূলক অনেক বেশি। তাই এসব আম চাষে কৃষকরা এখন অধিক উৎসাহী।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ৯৫০ হেক্টর জমিতে গৌড়মতি এবং ২ হাজার ৪৪৫ হেক্টরে বারি আম-৪-এর চাষ হয়েছে। গত বছর এই সংখ্যাটি যথাক্রমে ছিল ৭১০ এবং ১ হাজার ৯৭৮ হেক্টর। আশ্বিনা চাষ হয়েছে ৮৫০ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া কাটিমন জাতের বারোমাসি আম চাষেও আগ্রহ বাড়ছে, যা এ বছর বেড়ে হয়েছে ৫৬০ হেক্টর।

এ বছর জেলায় আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ৫০ হাজার মেট্রিক টনই হবে নাবি জাতের আম।

সাপাহারের চাষি রায়হান আলম গৌড়মতি চাষ করছেন ৩০ বিঘায় এবং বারি আম-৪ চাষ করছেন ১০ বিঘায়। গত বছর গৌড়মতি আম থেকে পেয়েছিলেন ২৫০ মণ, আর বারি আম-৪ থেকে ১২০ মণ। তার ভাষায়, “ভরা মৌসুমে অন্যান্য আম বিক্রি হয় ১ থেকে ৩.৫ হাজার টাকায়, কিন্তু বারি আম-৪ বিক্রি হয় ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা মণ দরে। গৌড়মতি তো ১২ হাজার টাকাও পেয়েছি।”

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা জানান, বারি আম-৪ ও গৌড়মতি—দুই জাতই ফলন ভালো দেয়। যেখানে সাধারণ আমে বিঘাপ্রতি ফলন হয় ৪০-৬০ মণ, সেখানে এই জাতগুলোতে হয় ৬০-৮০ মণ। তবে গৌড়মতি আমের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় ১০ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়, কারণ শতভাগ ব্যাগিং করতে হয়। তবে বাজারে দাম বেশি থাকায় লাভও বেশি।

পত্নীতলার কৃষক সাখাওয়াত হোসেন যিনি ২৫০ বিঘা জমিতে আমচাষ করেন, এবার ৩৫ বিঘায় বারি আম-৪ ও ২০ বিঘায় গৌড়মতি আম চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “নতুন কৃষকদের পরামর্শ থাকবে—যদি টিকে থাকতে চান, তবে আম্রপালির পাশাপাশি গৌড়মতি ও বারি-৪ চাষ করুন।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নওগাঁর উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, “নাবি জাতের আম আসায় এখন সারা বছর ছয় থেকে সাত মাস পর্যন্ত বাজারে আম পাওয়া যাচ্ছে। আগে মৌসুম ছিল মাত্র তিন মাসের।”

তিনি আরও জানান, গৌড়মতি আম দামে চারগুণ বেশি পাওয়া যায়, কারণ মৌসুম শেষে বাজারে এ জাতের চাহিদা বাড়ে এবং সরবরাহ কম থাকে। ফলে কৃষক যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি ক্রেতারাও পাচ্ছেন সারা বছর আম খাওয়ার সুযোগ।

নাবি জাতের আম চাষ বাংলাদেশের আমচাষ ব্যবস্থাকে শুধু সময়েই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও প্রসারিত করছে। ফলে কৃষক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা—সব পক্ষই উপকৃত হচ্ছে। তবে এই চাষের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রোগবালাই প্রতিরোধ, সংরক্ষণ ও রপ্তানি সহায়ক নীতিমালা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন কৃষিবিদরা।

মতামত দিন