ইসলামের আলো
ছবি: সংগৃহীত

জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ‘ইস্তিখারা’: ইসলামী পদ্ধতি ও গুরুত্ব।

জীবনের নানা সংকটে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের মুহূর্তে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব স্বাভাবিক।এমন সময় ইসলাম একটি নির্ভরযোগ্য ও আত্মিক প্রশান্তিদায়ক পদ্ধতি শিখিয়েছে—যার নাম ইস্তিখারা।

এর মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর কাছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কল্যাণ ও সঠিক পথের দিকনির্দেশনা কামনা করে থাকেন।

ইস্তিখারা: অর্থ ও তাৎপর্য

‘ইস্তিখারা’ শব্দটি আরবি, যার শাব্দিক অর্থ—কল্যাণ প্রার্থনা করা। ইসলামী পরিভাষায়,এটি এমন একটি দোয়া ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কোনো কাজের জন্য ভালো দিক নির্দেশনা চাওয়া, যার ভালো-মন্দ সম্পর্কে মানুষ নিশ্চিত নয়।

হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত—“নবীজি (সা.) আমাদের কোরআনের সুরা শেখানোর মতো করে ইস্তিখারার নিয়ম শেখাতেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬৬)

কখন ইস্তিখারা করবেন?

ইস্তিখারার প্রয়োজন হয় তখনই, যখন কোনো বৈধ কাজ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশয় বা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। যেমন—বিয়ে, চাকরি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, ভ্রমণ বা বাসস্থানের পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো।

ইস্তিখারার আগে অবশ্যই সচেতনভাবে চিন্তা-ভাবনা ও পরামর্শ নেওয়া উচিত। কোরআনে আল্লাহ বলেন—

“তুমি তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো; আর একবার যখন তুমি কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হও, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)

ইস্তিখারার সহজ পদ্ধতি:

ইস্তিখারা করার জন্য কোনো আলাদা সময় বা বিশেষ মুফতি বা পীরের দরকার নেই—যেকোনো ব্যক্তি নিজেই আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করতে পারেন। পদ্ধতিটি খুবই সহজ:

১. দুই রাকাত নফল নামাজ

নিয়ত করে, যেকোনো সময় (তাহাজ্জুদের সময় হলে উত্তম) দুই রাকাত নামাজ আদায় করুন। এটি ফরজ নামাজের অন্তর্ভুক্ত নয়।

২. ইস্তিখারার দোয়া

নামাজ শেষে হাদিসে বর্ণিত বিশেষ দোয়াটি পড়তে হয়। প্রয়োজনে কাগজ দেখে অথবা ফোনে দেখে পড়া যেতে পারে। দোয়ার মধ্যে “হাজাল আমর” (এই কাজ) অংশে নির্দিষ্ট বিষয়টির কথা মনে করে নিতে হয়।

ইস্তিখারার দোয়ার অনুবাদ অর্থ:

“হে আল্লাহ! আমি তোমার জ্ঞান দ্বারা কল্যাণ প্রার্থনা করি, তোমার শক্তি দ্বারা সাহায্য কামনা করি, এবং তোমার মহান অনুগ্রহ চাই। নিশ্চয়ই তুমি সবকিছু পারো, আমি পারি না; তুমি জানো, আমি জানি না; আর তুমি অদৃশ্যের পরিপূর্ণ জ্ঞাত।

হে আল্লাহ! যদি তুমি জানো এই কাজটি (উল্লেখযোগ্য বিষয়টি মনে রাখবেন) আমার দ্বীন, জীবনযাপন এবং ভবিষ্যতের জন্য ভালো, তাহলে সেটিকে আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও, সহজ করে দাও এবং তাতে বরকত দাও।

আর যদি তুমি জানো এই কাজটি আমার জন্য খারাপ, তাহলে আমাকে তা থেকে দূরে রাখো এবং আমাকে অন্য ভালো পথ নির্ধারণ করে দাও ও তাতে আমাকে সন্তুষ্ট করো।”

ইস্তিখারার ফল কীভাবে বোঝবেন?

অনেকে মনে করেন, ইস্তিখারার পর স্বপ্নে উত্তর পাওয়া বাধ্যতামূলক। তবে এটি ভুল ধারণা। ইস্তিখারার প্রকৃত ফল বোঝা যায় অন্তরের প্রশান্তি, কোনো পথ সহজ হয়ে যাওয়া বা কোনো সিদ্ধান্তে প্রবলভাবে ঝোঁক অনুভব করার মাধ্যমে। অনেক সময় পরিস্থিতি এমনভাবে ঘটে, যা সিদ্ধান্তকে পরিষ্কার করে দেয়।

ইস্তিখারা নিয়ে অতিরিক্ত বিশ্বাস বা ভুল ধারণা পরিহার করুন।

ইস্তিখারার নাম করে অন্য কাউকে টাকা দিয়ে নামাজ পড়ানো বা দোয়া করানোর প্রথা ইসলামে নেই। এটি ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যম—নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের প্রকাশ।

শেষ কথা,

ইস্তিখারা হলো আত্মবিশ্বাস, সঠিক দিকনির্দেশনা ও আল্লাহর উপর ভরসা রাখার একটি পবিত্র পন্থা। এটি শুধু দোয়া নয়, বরং একজন মুসলমানের হৃদয়ের পরম নির্ভরতার প্রকাশ। তাই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বিভ্রান্ত না হয়ে ইস্তিখারার দ্বারস্থ হওয়াই উত্তম।

মতামত দিন