আন্তর্জাতিক
ছবি: সংগৃহীত

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শেষ জনচক্ষুর আড়ালে খামেনি,উদ্বেগ বাড়ছে ইরানে।

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের টানা ১২ দিন পর সাময়িক শান্ত বিরাজ করলেও ইরানে শুরু হয়েছে ভিন্ন রকম এক অস্থিরতা। সশস্ত্র সংঘর্ষের সময় থেকে আজ পর্যন্ত জনগণের সামনে আসেননি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
তার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি ঘিরে ছড়িয়ে পড়েছে নানা গুঞ্জন, উদ্বেগ ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

গোপন বাঙ্কারে অবস্থানের গুঞ্জন থাকলেও তার শারীরিক অবস্থান, নিরাপত্তা কিংবা নেতৃত্বের ভূমিকায়  তিনি এখনো কতটা সক্রিয়, এসব নিয়ে জনসাধারণের মনে প্রশ্নের অন্ত নেই।

এক রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন উপস্থাপক সরাসরিই বলেন— “দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে, মানুষ জানতে চায় তাদের নেতা কোথায়?” খামেনির দপ্তরের কর্মকর্তা মেহদি ফাজায়েলি এ প্রশ্নের উত্তরে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও সরাসরি কিছু বলেননি।

তিনি বলেন, “নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সবাই দোয়া করুন, তিনি যেন নিরাপদে থাকেন।”

সামরিক হামলার ভয়াবহতা ও খামেনির ‘নিরাপদ দূরত্বে’ থাকা—এই বাস্তবতা একই সঙ্গে ইরানের জনমনে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে জোট গঠনের তোড়জোড়

খামেনির অনুপস্থিতিতে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একাধিক সরকারি সূত্র জানায়, পর্দার আড়ালে জোটবদ্ধ হচ্ছেন বিভিন্ন সামরিক ও  রাজনৈতিক গোষ্ঠী। কারো অবস্থান মধ্যপন্থী, কেউ আবার উগ্র রক্ষণশীল।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন একটি পরিমিতপন্থী ধারা। তারা সংযম ও কূটনীতির মাধ্যমে সংকট মোকাবেলার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফের আলোচনায় বসার ইঙ্গিতও দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।

যুদ্ধের ছায়ায় জনআস্থা

জনগণের মনে নানা প্রশ্ন—সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তে খামেনির কতটা ভূমিকা ছিল? তিনি এখনো সিদ্ধান্তদাতা, নাকি সিদ্ধান্ত শুধু তার নামে অনুমোদিত?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক হামজা সাফাভি বলেন, “খামেনির প্রতি হামলার আশঙ্কা এখনো বাস্তব। তাই তার আশপাশে নিরাপত্তাবলয় অতিমাত্রায় জোরদার করা হয়েছে।”

তিনি ইঙ্গিত দেন, যদিও সরাসরি দৃশ্যমান না, খামেনি এখনো দূর থেকে সীমিত কিছু সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিচ্ছেন।

‘মানবিক সংহতি’কে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা

সরকার যুদ্ধোত্তর জনগণের আবেগ ও ঐক্যকে কাজে লাগাতে শুরু করেছে। রাজধানী তেহরানে আলোক প্রদর্শনী ও খোলা কনসার্টে সেই বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। সরকার চায়, এই আবেগ দেশ পুনর্গঠনে ইতিবাচক শক্তিতে রূপ নিক।

সমালোচনাও মুখ গুঁজে নেই

অবশ্য ভিন্ন মতাবলম্বী গোষ্ঠীগুলোও নীরব নয়। সাঈদ জলিলির নেতৃত্বে একটি কট্টর রক্ষণশীল গোষ্ঠী সরকারের যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক নরম অবস্থানকে সমালোচনার কাঠগড়ায় তুলেছে। তারা প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের নেতৃত্ব ও কৌশলকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রেসিডেন্টের দপ্তরের পক্ষ থেকেও পাল্টা জবাব এসেছে— “আমরা একের পর এক যুদ্ধ মোকাবিলা করছি, এখন কি কলমের লড়াইটাও চালাতে হবে?” এমন বার্তায় তারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

প্রশ্ন উঠছে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও

খামেনির অনুপস্থিতিতে পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়েও দানা বাঁধছে প্রশ্ন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ মূল প্রকল্পগুলো চলমান থাকবে।

‘সার্বভৌম নেতার’ ভবিষ্যৎ নিয়ে অপেক্ষা

বিশ্লেষক সানাম ভাকিল মনে করেন, খামেনির এই অনুপস্থিতি ইরানকে এক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। তিনি বলেন, “আগামী আশুরার আগেই যদি খামেনিকে প্রকাশ্যে না দেখা যায়, তা হবে স্পষ্ট রাজনৈতিক সংকেত।”

সব মিলিয়ে, সামরিক যুদ্ধের পর এক নতুন নেতৃত্বসংকট ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্বে প্রবেশ করেছে ইরান।

মতামত দিন