এলডিসি উত্তরণে টেকসই সংস্কারে সহায়তা দিতে প্রস্তুত জাতিসংঘ।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকে আরও টেকসই করতে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির বাংলাদেশে আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস বলেন, টেকসই সংস্কার, জলবায়ু সহনশীলতা, অর্থনৈতিক রূপান্তর ও জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ পাশে থাকবে।
বৃহস্পতিবার (১৫ মে) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও জাতিসংঘ কান্ট্রি টিমের (ইউএনসিটি) যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির (জেএসসি) দ্বিবার্ষিক সভায় এসব কথা বলেন তিনি। বৈঠকে সহ-সভাপতিত্ব করেন ইআরডির সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী ও গোয়েন লুইস। উপস্থিত ছিলেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা।
লুইস বলেন, “বাংলাদেশের জন্য বিগত বছরটি চ্যালেঞ্জিং হলেও দেশের মানুষ আত্মমর্যাদাবোধ ও দৃঢ়তা দেখিয়েছে। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশের অংশীদারত্ব আমাদের অভিন্ন মূল্যবোধ ও আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।”
২০২৪ সালের সহায়তা ও অগ্রাধিকার:
সভায় ২০২৪ সালের জাতিসংঘ কান্ট্রি রেজাল্ট রিপোর্ট প্রকাশ করা হয় এবং আগামী বছরের জন্য কৌশলগত অগ্রাধিকার অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে ২১ কোটি ৫০ লাখ ডলার সহায়তা দিয়েছে। এই অর্থায়নে যেসব কাজ সম্পন্ন হয়েছে:
-
এলডিসি উত্তরণ কৌশল তৈরিতে সহায়তা
-
বেসরকারি খাতে ৪ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান
-
১১৬টি প্রতিষ্ঠানের টার্নওভার উন্নয়ন
-
১১ হাজারের বেশি তরুণকে ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ
জাতিসংঘের সহায়তায় অন্তত ৪ কোটি মানুষ সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পেয়েছে, যার মধ্যে ৫ লাখ ৮০ হাজার শিশু শিশু সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় এসেছে।পাশাপাশি সারা দেশে ৫৬ লাখ কিশোরীকে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি) টিকা দেওয়া হয়েছে, যা ১০–১৪ বছর বয়সী মেয়েদের অন্তত ৯৩ শতাংশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
জলবায়ু সহায়তা ও দুর্যোগ প্রতিরোধ: ২০২৪ সালে জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলায় ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সহায়তা সমন্বয় করেছে জাতিসংঘ। এ ছাড়া ১৭ লাখ ২০ হাজার দুর্যোগকবলিত মানুষকে মানবিক সহায়তা এবং ২০ লাখ মানুষের মধ্যে জলবায়ু ঝুঁকি বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা হয়েছে।
শাসনব্যবস্থা ও লিঙ্গ সমতা কার্যক্রমে জাতিসংঘ গ্রামীণ এলাকায় ৬৬ শতাংশ গ্রাম্য আদালত সক্রিয় রাখতে সহায়তা করেছে, যা ৬ কোটি ১০ লাখ মানুষকে সেবা পৌঁছে দিতে সহায়ক হয়েছে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন ও গার্হস্থ্য সহিংসতা আইন সংশোধনেও সংস্থাটি সমর্থন দিয়েছে।
পরিকল্পনা সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা: সরকার অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এক বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায়, ইউএনএসডিসিএফ (২০২২–২০২৬) কাঠামোও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতিসংঘের কাজ চলবে।
সভা শেষে ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঘোষণাপত্র’ এবং ‘যুব সম্পৃক্ততা’ নিয়ে বিশেষ সেশন হয়। অংশগ্রহণকারীরা সাম্প্রতিক ‘সামিট অব দ্য ফিউচার’-এর ধারাবাহিকতায় তরুণদের কণ্ঠস্বর ও আন্তঃপ্রজন্ম সমতা জাতীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দেন।
ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের বলেন, “জাতিসংঘের চলমান সহযোগিতার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। ইউএনএসডিসিএফ কাঠামোর সম্প্রসারণ আমাদের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।”
তিনি আরও বলেন, “তিন শূন্য নীতি বাস্তবায়নে যুবকদের কর্মসংস্থান, সামাজিক উদ্যোগ এবং প্রভাবভিত্তিক অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু অর্থায়ন, স্থানীয় শাসন এবং নির্বাচনী সংস্কারে জাতিসংঘের কার্যকর সহযোগিতা জরুরি।”
পরবর্তী পদক্ষেপ: বৈঠকে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইউএনএসডিসিএফের চূড়ান্ত মূল্যায়নের সূচনা ও এসডিজি ও এলডিসি উত্তরণে গতি আনার প্রতিশ্রুতি গৃহীত হয়।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সহযোগিতা কাঠামো (ইউএনএসডিসিএফ) এসডিজি অর্জনে পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে:
-
অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন
-
সমতার ভিত্তিতে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কল্যাণ
-
টেকসই ও সহনশীল পরিবেশ
-
রূপান্তর ও অংশগ্রহণভিত্তিক সুশাসন
-
লিঙ্গ সমতা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা নির্মূল
জেএসসির পরবর্তী সভা ২০২৫ সালের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ ঢাকা কার্যালয়।
মতামত দিন