শ্রমিকদের অধিকারের প্রশ্নে থেমে আছে সংস্কার, শুধু পোশাক খাতে আংশিক অগ্রগতি।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ব্যাপারে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। এখন পর্যন্ত শুধু পোশাক খাতের শ্রমিকরা আন্দোলনের ফসল হিসেবে কিছুটা বাড়তি মজুরি পেয়েছেন।
সরকার চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে পোশাক খাতের বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করেছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বাড়লেও বাস্তবে শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি, বরং কিছুটা কমেছে।
চামড়া শিল্পে নতুন মজুরিকাঠামো ঘোষিত হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। শ্রমিক নেতারা বলছেন, সরকারের প্রজ্ঞাপন থাকলেও কোনো কারখানায় সেটি কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত বা যেসব খাতে এখনো ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয়নি, সেসব খাতের শ্রমিকদের জন্য এখনো পর্যন্ত কোনো ঘোষণা নেই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাত মিলিয়ে ৭ কোটি ৬৫ লাখ শ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। সরকার স্বীকৃত ১৪২টি খাত ও উপখাতের মধ্যে মাত্র ৪৩টিতে ন্যূনতম মজুরির কাঠামো রয়েছে। বাকিগুলো এই কাঠামোর বাইরেই রয়ে গেছে, যেখানে শ্রমিকদের কোনো আইনগত সুরক্ষা নেই।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি, লে-অফ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ছাঁটাইসহ নানা ইস্যুতে আন্দোলন-বিক্ষোভ সামলাতে হচ্ছে। এর মধ্যে বেক্সিমকো শিল্পপার্কের অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি কারখানার প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে সরকারের হস্তক্ষেপে। বার্ডস গ্রুপ, টিএনজেড গ্রুপের শ্রমিকরাও বকেয়া মজুরি পেয়েছেন।
তবে মে দিবসের প্রাক্কালে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—৮৫ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য কী করছে সরকার? শ্রম মন্ত্রণালয় বলছে, তারা আপাতত পরিস্থিতি সামলাতে ব্যস্ত। সংস্কার পরিকল্পনা রয়েছে, তবে তা বাস্তবায়নের সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি।
শ্রম মন্ত্রণালয় জানায়, গত ৯ মাসে তারা মূলত তিনটি বড় কাজে নিয়োজিত ছিল: শ্রমিক-মালিক যৌথ ১৮ দফা ঘোষণা, শ্রম আইন সংশোধনের উদ্যোগ এবং বেক্সিমকো শিল্পপার্কের সংকট নিরসনে উপদেষ্টা কমিটি গঠন। তবে এ তিনটিরই বাস্তবায়ন আংশিক, এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য কোনো তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ নেই।
নতুন শ্রম আইনের খসড়ায় ‘ভবিষ্য তহবিল’ বা ‘গ্র্যাচুইটি’ বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর ন্যূনতম মান অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। আইবিসির সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার বলেন, "৯ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণাও এখনো অধিকাংশ কারখানায় কার্যকর হয়নি। শ্রমিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলাগুলোও প্রত্যাহার করা হয়নি।"
এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস—শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক দিন। ‘শ্রমিক-মালিক এক হয়ে, গড়ব এ দেশ নতুন করে’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে সরকার ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

মতামত দিন