বকেয়া ৫ হাজার ৭০৭ কোটি টাকার দাবিতে প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি আদানির।
বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিদ্যুৎ বিল বাবদ বকেয়া টাকা দ্রুত পরিশোধের অনুরোধ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন ভারতের আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। প্রথমবারের মতো পাঠানো এই চিঠিতে তিনি বকেয়া আদায়ে প্রধান উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
চিঠিতে আদানি জানিয়েছেন, পেমেন্টে দেরি হওয়ায় বিদ্যুৎ প্রকল্পের ঋণদাতা সংস্থা ও অংশীদারদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে ইতোমধ্যে চিঠিটি বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কাছে আদানির বকেয়া প্রায় ৪৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ৭০৭ কোটি টাকার সমান (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে)।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, আদানির বকেয়া পরিশোধ নিয়ে পিডিবির সঙ্গে আলোচনা চলছে। তিনি জানান, গত জুলাইয়ে আগের সব বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছিল, এরপর নতুন করে এই পাওনা জমেছে।
গত জুনে বাংলাদেশ একসঙ্গে ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছিল—যা ছিল আদানির প্রাপ্ত সবচেয়ে বড় এককালীন অর্থপ্রাপ্তি। এর আগে প্রতি মাসে গড়ে ৯০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার করে বিল পেত ভারতীয় এই কোম্পানিটি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “বর্তমান বকেয়াটা নতুন। আগেরগুলো পরিশোধ করা হয়েছে। এটা নীতিগত নয়, ব্যবসায়িক লেনদেনের বিষয়। পিডিবি কাজ করছে, আমরা চিন্তিত নই।”
গত ২৯ সেপ্টেম্বর পাঠানো চিঠিতে গৌতম আদানি উল্লেখ করেন, গোড্ডা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহে পিডিবির সঙ্গে তাদের চুক্তি রয়েছে। তিনি লিখেছেন, “আমরা এ পর্যন্ত পাওয়া অর্থের প্রশংসা করছি, যা কিছুটা হলেও বকেয়া কমাতে সাহায্য করেছে। তবে এখনো প্রায় ৪৬৪ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বকেয়া বাকি রয়েছে, যা ঋণদাতাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।”
চিঠিতে আরও বলা হয়, “২৩ জুন পিডিবির সঙ্গে বৈঠকে জানানো হয়েছিল যে সব বকেয়া ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করা হবে, কিন্তু এখনো কোনো সময়সূচি বা পরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। তাই বকেয়া নিষ্পত্তির জন্য আপনার (প্রধান উপদেষ্টা) ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
এদিকে, আদানি ও পিডিবির মধ্যে কয়লার দাম নিয়ে দ্বন্দ্ব এখনো মীমাংসিত নয়। বিদ্যুৎ ব্যয়ের সূত্র নিয়ে বিরোধের জেরে জুন মাসে পিডিবি আদানিকে কয়লার দাম পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সূত্রে সামঞ্জস্য করার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু আদানি বিদ্যমান চুক্তির শর্ত দেখিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে।
পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, যদি আদানি বিতর্কিত শুল্ক পর্যালোচনায় রাজি হয়, তাহলে তাদের শীতকালে ভারতীয় বাজারে বিদ্যুৎ বিক্রির অনুমতি দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি সক্ষমতা সংশোধনের জন্য একটি সম্পূরক চুক্তির প্রয়োজন হবে।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিশেষ সুবিধায় আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা পরে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সরকার পরিবর্তনের পর চুক্তি বাতিলের দাবি ওঠে। এর প্রেক্ষিতে গঠিত উচ্চপর্যায়ের জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি আদানির চুক্তি আন্তর্জাতিক হওয়ায় আইনি পদক্ষেপ নিতে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সালিশ কেন্দ্রে যাওয়ার সুপারিশ করে।
২০১৭ সালে ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় ১,৪৯৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করে আদানি। চুক্তি অনুযায়ী, এই কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ ২৫ বছর বিদ্যুৎ কিনবে। পাওয়ার গ্রিডের তথ্যমতে, গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় গোড্ডা প্লান্ট থেকে ১,২৬৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

মতামত দিন