অর্থনীতি
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে রেমিট্যান্সে ৫% করের প্রস্তাব, শঙ্কায় পড়বে বাংলাদেশ।

বাণিজ্যে চীনের বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপের পর এবার প্রবাসী আয়ের ওপর ৫ শতাংশ কর বসাতে চাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অভিবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সকে টার্গেট করে এই প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এ, যা হাউস বাজেট কমিটিতে ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে।

সব অভিবাসীর ওপরই কর প্রযোজ্য ?

১ হাজার ১১৬ পৃষ্ঠার এই বিল অনুযায়ী, মার্কিন নাগরিক ব্যতীত সব অভিবাসীর প্রেরিত অর্থে কর আরোপ হবে। এর আওতায় পড়বেন গ্রিন কার্ডধারী ও এইচ-১বি ভিসাধারীরাও।কর আরোপের ক্ষেত্রে কোনো ন্যূনতম অর্থ নির্ধারিত হয়নি—অর্থাৎ যত ছোট অঙ্কের রেমিট্যান্সই হোক না কেন, তাতে কর দিতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো কমে যেতে পারে, যা বাংলাদেশসহ বহু উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক বার্তা।

রেমিট্যান্সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম উৎস

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ৪২৭ কোটি ১০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স (প্রায় ৫২ হাজার ২৬ কোটি টাকা)। এর ওপর ৫% কর আরোপিত হলে অতিরিক্ত কর হিসেবে দিতে হবে প্রায় ২১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা।

শুধু গত এপ্রিলেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ৩৩ কোটি ৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৪৫৩ কোটি ডলার,যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি।

‘দায়বিহীন’ ডলার প্রবাহে বাধা আসবে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসী আয় হলো বৈদেশিক মুদ্রার ‘দায়বিহীন’ উৎস—এর বিপরীতে কোনো কাঁচামাল আমদানি বা ঋণ পরিশোধ করতে হয় না। ফলে এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়। ট্রাম্পের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সেই দায়মুক্ত ডলারের প্রবাহে বড় ধাক্কা লাগবে।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে ভারত (১২৯ বিলিয়ন ডলার), আর বাংলাদেশ পেয়েছে ২৬.৬ বিলিয়ন ডলার—ষষ্ঠ অবস্থানে।

প্রেরণ প্রক্রিয়ায় বৈশ্বিক পরিবর্তন

বর্তমানে বৈশ্বিক রেমিট্যান্স প্রেরণে বড় বড় প্রতিষ্ঠান যেমন ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ও মানিগ্রাম অ্যাগ্রিগেটেড পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহ করে। তারা বিভিন্ন দেশের ছোট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে রেমিট্যান্স কিনে, একত্র করে নির্দিষ্ট একটি দেশ থেকে প্রেরণ করে থাকে। এতে করে প্রেরণের উৎস ও প্রবাহের হিসাব অনেক সময় বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে, যা এখন দেশগুলো পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

আনুষ্ঠানিক চ্যানেল কমলে বেড়ে যেতে পারে হুন্ডি

বিশ্লেষকদের শঙ্কা, এই কর আরোপ হলে অনেক প্রবাসী আনুষ্ঠানিক চ্যানেল এড়িয়ে অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠাতে পারেন। এতে যেমন সরকার রাজস্ব হারাবে, তেমনি হুন্ডি বা অবৈধ মুদ্রা পাচারও বাড়বে। ফলে অর্থনীতির জন্য এটি হতে পারে একটি মারাত্মক আঘাত।

উপসংহার

ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই আইন যদি চূড়ান্তভাবে পাস হয়, তাহলে শুধু বাংলাদেশ নয়—ভারত, মেক্সিকো, ফিলিপাইনসহ রেমিট্যান্সনির্ভর অনেক উন্নয়নশীল দেশ সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক স্থিতিশীলতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

মতামত দিন