রাজউকের কর্মকর্তার শত কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ, স্ত্রীর নামে রাজধানীতে ৩৬টি ফ্ল্যাট।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এক কর্মকর্তা আমীর খশরুর বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনের নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক বহুতল ভবন ও জমি।
রোববার (১৮ মে) সমকাল অনলাইনে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে।
নব্বইয়ে যোগদান, দীর্ঘ বরখাস্ত
নব্বই দশকে রাজউকে উপ-ইমারত পরিদর্শক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন আমীর খশরু। সেই সময় তার বেতন স্কেল ছিল ১,৪৮০ টাকা; মাসে মূল বেতন ছিল প্রায় চার হাজার টাকা। চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ ওঠে।এসবের প্রেক্ষিতে তিনি এক যুগেরও বেশি সময় সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন।
বর্তমানে তার মাসিক বেতন ৫০ হাজার টাকার আশপাশে হলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার এবং তার স্ত্রীর নামে একাধিক বাড়ি ও প্লট রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
রাজধানীতে একাধিক ভবন
বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্পে ১০ নম্বর রোডের ৭৪ নম্বর হোল্ডিংয়ে ছয়তলা একটি ভবনের মালিক আমীর খশরু। ভবনটিতে রয়েছে ১১টি ফ্ল্যাট, পার্কিং ও গার্ডরুম।
একই প্রকল্পের ১১ নম্বর রোডে দুটি তিন-কাঠার প্লট একত্র করে ছয়তলা আরেকটি ভবন নির্মাণ করেছেন তিনি। ভবনটির তিনটি ফ্ল্যাট ইতিমধ্যে বিক্রি করে দিয়েছেন। প্রতিটি ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা।
১২ নম্বর রোডে তিন কাঠার ওপর নির্মিত একটি ছয়তলা ভবনের মালিকানা নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা। ভবনটির মালিক হিসেবে কাগজে নাম থাকলেও স্থানীয়দের মতে এটি খশরুর মালিকানাধীন এবং তার আত্মীয়ের নামে করা হয়েছে।
পুরোনো বাড়ি ও আত্মপক্ষ সমর্থন
খশরুর প্রথম বাড়ি পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ৭৪১ নম্বর হোল্ডিংয়ে। ছয়তলা ভবনটিতে রয়েছে ১৭টি ফ্ল্যাট। বর্তমানে তিনি সেখান থাকেন না, তবে আত্মীয়দের মাধ্যমে ভাড়া আদায় করেন।
এই সব সম্পদ অর্জনের বিষয়ে খশরু দাবি করেন, তার স্ত্রী ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে বাড্ডা প্রকল্পের অ্যাওয়ার্ড কিনে নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “একেকটি অ্যাওয়ার্ড ৪০-৫০ হাজার টাকায় কেনা যেত। পরে ডেভেলপারের মাধ্যমে বাড়ি করে অর্ধেক ফ্ল্যাট পেয়েছি।”
তবে অন্যান্য সম্পদ, বিশেষ করে আত্মীয়দের নামে থাকা বাড়িগুলোর মালিকানা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করেন, “আত্মীয়স্বজনের কার কী সম্পত্তি আছে, তা আমি জানি না।”
উত্তরার দুই প্লট
উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর রোডে পাঁচ কাঠার একটি প্লট রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
১৩ নম্বর সেক্টরে আরেকটি প্লটের মূল্যও আনুমানিক ১৫ কোটি টাকা।
একটি প্লটের মালিক তার মা বলে দাবি করলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অন্য প্লটটিও তিনি ভাড়া দেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে খশরু কোনো মন্তব্য করেননি।
একাধিকবার বরখাস্ত ও মামলার ইতিহাস
ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে প্লটের ফাইল আটকে রেখে বাণিজ্যের অভিযোগে যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন খশরু। তখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে মামলা করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে মামলাটি থেকে দায়মুক্তি পান তিনি। তার আইনজীবী ছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন—এ তথ্য খশরু নিজেই নিশ্চিত করেছেন।
পরে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরও একটি মামলা করে দুদক। মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এ মামলায় তিনি আবারও সাময়িক বরখাস্ত হন।
রাজনীতির ছায়া ও পুনরায় বদলি
১৯৯৩ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই রাজউকের বিএনপিপন্থি শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন খশরু। একসময় ওই ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। এতে রাজউকে তার প্রভাব ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়।
গত ৬ আগস্ট তিনি রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যানের ওপর দলবল নিয়ে চাপ সৃষ্টি করে ‘ইন্সপেক্টর’ পদে নিজেকে নিয়োগ দেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে রাজউকে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে তাকে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে বদলি করা হয়। তবে তিন মাসের মাথায় তিনি আবার রাজউকে ফিরে আসেন।
বদলি প্রসঙ্গে খশরু দাবি করেন, “আমাকে অন্যায়ভাবে বদলি করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ ভুল বুঝে আমাকে ফেরত এনেছে।”

মতামত দিন