অপরাধ
ছবি: সংগৃহীত

দুদকের কবজায় ১৫৮ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নথি: তদন্তের মুখে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে অনুমোদিত ১৫৮টিরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল ও চুক্তিসংক্রান্ত নথি এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হেফাজতে। সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের বিরুদ্ধে ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতসহ নানা অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এসব নথি তলব করে দুদক।

৬ মে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে এসব নথি চায় অনুসন্ধান দলের প্রধান ও দুদকের উপপরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন। বিউবো জানিয়েছে, চাওয়া অনুযায়ী সব নথি ইতিমধ্যে দুদকে হস্তান্তর করা হয়েছে।

চলেছে হরিলুট, গচ্ছিত লাখো কোটি টাকার বিল

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ খাতে ক্ষমতাসীনদের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০ এর সুযোগে বিনা দরপত্রে শতাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের। তিন মেয়াদে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের মোট ব্যয়  প্রায় ২ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার—টাকার অঙ্কে যা পৌনে ৪ লাখ কোটি।

এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি গিয়েছে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কেন্দ্র গড়ে বছরজুড়ে ২৫–৩০ শতাংশ সক্ষমতায় চলেছে, অথচ চুক্তি অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিতের কথা ছিল ৮০–৮৫ শতাংশ। এমনকি প্রয়োজন না থাকলেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানো হয়, যেগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের পকেট ভারী করা।

বিনা দরপত্রে সুবিধা পেয়েছে কারা?

জরুরি বিশেষ আইনের অধীনে অনুমোদিত ৭২টি রেন্টাল ও আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় অংশ পেয়েছে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী গোষ্ঠী। সামিট, ইউনাইটেড, ডরিন, দেশ এনার্জি, কনফিডেন্স, ওরিয়ন, বাংলাক্যাটসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান এই সুবিধাভোগীদের তালিকায়।

  • সামিট গ্রুপ: ৭টি কেন্দ্র, ভাড়া বাবদ পেয়েছে ১,৯৫৭ কোটি টাকা

  • ইউনাইটেড গ্রুপ: ৫টি কেন্দ্র, পেয়েছে ১,৬৮২ কোটি টাকা

  • কনফিডেন্স: ৬টি কেন্দ্র, পেয়েছে ৯৬২ কোটি টাকা

  • ডরিন: ৬টি কেন্দ্র, পেয়েছে ৬৩৫ কোটি টাকা

  • দেশ এনার্জি: ৪টি কেন্দ্র, পেয়েছে ৫১৫ কোটি টাকা

দেশ এনার্জি ছিল প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের মালিকানাধীন,আর ডরিন পাওয়ারের মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি তাহজীব আলম সিদ্দিকী—যিনি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর পুত্র।

তলবকৃত নথির পরিধি

দুদকের চিঠিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি, পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (পিপিএ), ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্টসহ আর্থিক লেনদেন ও বকেয়ার নথি চাওয়া হয়েছে। চিঠির আওতায় ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির (বাহারামপুর, ত্রিপুরা ও ঝাড়খণ্ডের আদানি পাওয়ার) সংক্রান্ত তথ্যও অন্তর্ভুক্ত।

২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোর তালিকা

দুদক ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অনুমোদিত প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিস্তারিত তালিকা চেয়েছে। এতে রয়েছে:

  • ২০০৯–২০১০: শাহজীবাজার, ফেনী, কুমারগাঁও, উল্লাপাড়া, বাড়বকুণ্ডসহ ২১টি কেন্দ্র

  • ২০১১–২০১২: আশুগঞ্জ, মেঘনাঘাট, খুলনা, চাঁদপুরসহ প্রায় ৩৪টি কেন্দ্র

  • ২০১৩–২০১৫: রাউজান, আশুগঞ্জ, বিবিয়ানা, গাজীপুর, ভোলা, মেঘনাঘাটসহ ২১টি কেন্দ্র

  • ২০১৬–২০১৭: বরিশাল, নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, জামালপুর, ভেড়ামারা, কুশিয়ারা, বসিলা—মোট ১৪টি কেন্দ্র

প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি

দুদক অনুসন্ধান সূত্র জানায়,সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু নিজস্ব বলয়ের লোকদের প্রাধান্য দিয়ে প্রকল্প অনুমোদন দেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি জমি দখল করে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে অর্থ পাচারের।

বিউবোর অবস্থান

বিউবো চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘আমরা দুদকের চিঠি অনুযায়ী সব নথি সরবরাহ করেছি। বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া দরকার। দুদককে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি।’

মতামত দিন