আইডিয়াল স্কুলে সিন্ডিকেটের কারসাজি: ১৬ বছরে ৩০০ কোটি টাকার দুর্নীতি।
রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৯ হাজার ২১৪ শিক্ষার্থীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভর্তি করা হয়, যা মোট ভর্তির সাড়ে ৪ শতাংশ। এ অনিয়মের মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
প্রথম শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে। দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি ও নবম শ্রেণিতেও ভর্তি হয়েছে জেএসসি মেধাতালিকা ছাড়াই। মূল ভর্তি কার্যক্রম জানুয়ারিতে হলেও এসব অনিয়ম হতো মার্চ থেকে জুনে। ২০১৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত তিনটি শাখায় ৩৮০২ জন নিয়মবহির্ভূতভাবে ভর্তি হয়—এর মধ্যে ২৭৮৩ জন অতিরিক্ত, ৮৬৬ জন জাল ট্রান্সফার সার্টিফিকেটে (টিসি), ৩৬ জন বিশেষ বিবেচনায় ও ১১৭ জন সহোদর কোটায়। ২০১১ ও ২০১২ সালে আরও প্রায় ৪৮৫৬ শিক্ষার্থীকে অনিয়ম করে ভর্তি করা হয়।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালে ভিন্ন কৌশলে ভর্তি বাণিজ্য চলেছে। বয়সভিত্তিক জটিলতা ও সহোদর কোটার নামে ২০২৩ সালে ৩৫০ জন, ২০২৪ সালে ১৫০ জন ভর্তি হয়। অনুপস্থিত নথির কারণে ২০০৯, ২০১০ ও ২০১৩ সালের অনিয়মের পূর্ণ চিত্র জানা না গেলেও অনুমান করা হচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২২৩৫ শিক্ষার্থী অনিয়মে ভর্তি হয়। সে সময় গভর্নিং বডির সভাপতি ছিলেন বর্তমানে কারাবন্দি সাবেক এমপি রাশেদ খান মেনন। তার মেয়াদে ২৩৬৭ জন,এবং সাবেক সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানের সময় ২৯০ জন ভর্তি হয়। টিসির মাধ্যমে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অধিকাংশের রেকর্ড অনুপস্থিত। ২০২১ সালের একটি নথিতে দেখা গেছে,আট শিক্ষার্থীকে শাখা প্রধানদের কোটা দিয়ে ভর্তি করা হয়।কোটা না নেওয়ায় ২০২৪ সালে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইমাম হোসেনকে অপসারণ করা হয়।
২০০৯ থেকে অনিয়মের সময়কালজুড়ে অধ্যক্ষ ছিলেন ড. শাহান আরা বেগম। তাকে সহযোগিতা করতেন বহিষ্কৃত উপসহকারী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান খান। এ দুজন বনশ্রীতে একটি বেসরকারি স্কুল গড়েন এবং তাদের সন্তান সেখানে ভিশন-৭১ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি খুলে জমি ও ফ্ল্যাট ব্যবসা করেন।আতিকের বিরুদ্ধে ৭ কোটি টাকার সন্দেহভাজন লেনদেনসহ অবৈধ সম্পদের অভিযোগে দুদক মামলা করেছে। ৬ এপ্রিল দুর্নীতি মামলায় অধ্যক্ষ, আবু হেনা জামান ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মহাপরিচালক শহীদুল ইসলামসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।
২০২১ সালে শুধু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে ১৪১ জন ভর্তি হয়, অনেকের নামে সুপারিশপত্র ছিল না। জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলামের নামেও ভর্তির অভিযোগ রয়েছে। ভর্তি রেজিস্ট্রারে গরমিল ছিল, বোর্ড বা অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই আসন বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. ফেরদাউস জানান, তিনি ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়েছেন, আগের অনিয়মের বিষয়ে কিছু জানেন না। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং কাজ শুরু করেছে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের চেয়ারম্যান জিয়াউল কবির দুলু বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে এবং মন্ত্রণালয় জেনেও ব্যবস্থা নেয়নি।গভর্নিং বডির বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান না থাকায় অনিয়ম চলছেই।
মতামত দিন