সিলেটে পাথর লুট ঠেকাতে পাঁচ দফা পরিকল্পনা, অভিযানে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।
সিলেটে পাথর লুটপাট রোধ ও উদ্ধারকৃত পাথর পুনঃস্থাপনে পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। বুধবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় সিলেট সার্কিট হাউজে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় সরকারি বিভিন্ন দফতরের শীর্ষ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদ জানান, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী— জাফলং ইসিএ ও সাদা পাথর এলাকায় ২৪ ঘণ্টা যৌথ বাহিনী মোতায়েন থাকবে, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে চেকপোস্টে সার্বক্ষণিক নজরদারি চলবে, অবৈধ ক্রাশিং মেশিন বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে, পাথর চুরির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং উদ্ধার হওয়া পাথর পুনরায় পূর্বের স্থানে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
প্রশাসনের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা ও প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণহীন কর্মকাণ্ডে সাদা পাথরসহ সিলেটের বেশ কিছু পাথর কোয়ারি ধ্বংসের মুখে পড়ে। ২০২৩ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো— জামায়াত, বিএনপি, এনসিপি, চরমোনাই পীর ফজলুল হকসহ কয়েকটি সংগঠন— কোয়ারি চালুর দাবিতে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। তাদের অভিযোগ, ভারতের স্বার্থে আগের সরকার পাথর উত্তোলন বন্ধ রেখেছিল, আর সরকারি মহল সিলেটের বন্যার জন্য পাথর খননকে দায়ী করে নানা যুক্তি দেখিয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা ‘পাথর খেকো’ চক্র কখনো প্রকাশ্যে, কখনো রাতের আঁধারে সাদা পাথরের বিপুল পরিমাণ পাথর সরিয়ে নেয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান— চার বছর পরিবেশ আন্দোলনের মাধ্যমে সিলেটে পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখতে সক্ষম হলেও উপদেষ্টা পদে থেকেও তিনি তা ঠেকাতে পারেননি।
এরপর জেলা প্রশাসন নড়েচড়ে বসে এবং তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। সামাজিক সংগঠন ও পরিবেশবাদীরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। বুধবার দুদক সিলেট কার্যালয়ের উপপরিচালক রাফী মোহাম্মদ নাজমূস সাদাতের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি দল সাদা পাথর এলাকা পরিদর্শন করে। তদন্ত শেষে দুদক জানায়, এই লুটপাটে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ও স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুদক আরও জানায়, দূরবর্তী কার্যালয়ের কারণে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি, তবে যাদের যোগসাজশে এই লুটপাট হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। পাশাপাশি, স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা ও পর্যটন খাতের ক্ষতির সঙ্গে তাদের কোনো যোগসাজশ আছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন— প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পাথর লুটপাট অব্যাহত রয়েছে, যা প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পকেও মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
মতামত দিন