অবশেষে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ প্রকাশ।
একটি গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সনদের জন্ম
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র ও জনতার নেতৃত্বে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থান দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় সূচিত করে। এই গণজাগরণে এক হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হন। স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতনের পর জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনের দাবি উঠে আসে।
সনদের মূল প্রস্তাবনা ও প্রেক্ষাপট
সনদটির ভূমিকা অংশে বলা হয়, স্বাধীনতা যুদ্ধের মূলচেতনা – সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার – এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিগত পাঁচ দশকে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও দলীয় প্রভাবের কারণে কার্যকর হতে পারেনি। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে ক্ষমতার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের মাধ্যমে একটি শাসন-ব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়ে।
ষষ্ঠ কমিশন ও কার্যক্রম
গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ৬টি পৃথক সংস্কার কমিশন গঠন করে: সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন। এই কমিশনগুলো তাদের সুপারিশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করে জানুয়ারির মধ্যে।
পরবর্তী পর্যায়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয় যার কাজ ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি জাতীয় রূপরেখা প্রণয়ন করা। সেই ধারাবাহিকতায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রস্তুত করা হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সংলাপ
কমিশন ৩৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট থেকে মতামত সংগ্রহ করে এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত ৪৪টি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১৬৬টি সুপারিশ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়, যার মধ্যে ৭০টি সংবিধান সংশোধন, ২৭টি নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার এবং বাকিগুলো অন্যান্য ক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট।
দ্বিতীয় দফার সংলাপে ২০টি প্রস্তাবনায় আরও গভীর ঐক্যমত্য গড়ে ওঠে যা ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’- এর খসড়ায় প্রতিফলিত হয়েছে।
অঙ্গীকারনামা: ৭টি মূল প্রতিশ্রুতি
প্রতিবেদন শেষে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো ৭ দফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে:
-
সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
-
সংবিধান ও অন্যান্য আইন সংস্কারের মাধ্যমে সুপারিশ বাস্তবায়ন।
-
নতুন নির্বাচনের পর ২ বছরের মধ্যে সংস্কার সম্পন্নের অঙ্গীকার।
-
সময়মতো বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা।
-
আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ।
-
সনদ বাস্তবায়নে অটল থাকা।
-
২০২৪ সালের আন্দোলনের সংবিধানে স্বীকৃতি প্রদান।
পরবর্তী ধাপ
সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের কাজ নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উপসংহার:
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের নতুন যাত্রার দিকনির্দেশনা। এই সনদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার এনে একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হলো।

মতামত দিন