শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জলাবদ্ধতা: দুর্ভোগে যাত্রীরা, প্রশ্ন কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি নিয়ে
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—দেশের প্রধান ও সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। অথচ সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা, যা যাত্রীসাধারণ ও দর্শনার্থীদের জন্য ভয়াবহ দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃষ্টির পানিতে টার্মিনাল ভবনের আশপাশ, প্রবেশপথ এমনকি পার্কিং এলাকা পর্যন্ত জলমগ্ন হয়ে পড়ে। বন্দর ঘিরে থাকা ক্যানটিন, পার্কিং এলাকা ও সংযোগ সড়কে বিরাজ করছে চরম অপারিষ্কার ও নোংরা পরিবেশ। যাত্রী ও অভ্যর্থনাকারীরা প্রতিদিনই এসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিমানবন্দরের বাইরের ক্যানটিনগুলোতে খাদ্য Hygienic নয়, অনেক জায়গায় জমে থাকে আবর্জনা ও বর্জ্য। আশপাশের রাস্তা ও ফুটপাতে ছড়িয়ে থাকে পলিথিন, খাবারের উচ্ছিষ্ট ও প্লাস্টিক বোতল। পার্কিং এলাকায় ময়লার স্তূপ, দুর্গন্ধ ও অপর্যাপ্ত বাতি যাত্রীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য দুটোই বিঘ্নিত করছে।
অনেক যাত্রী অভিযোগ করেছেন, বিমানবন্দর চত্বরে ঢুকতেই যে চিত্র দেখা যায়, তা কোনো আন্তর্জাতিক স্থাপনার মানসন্ধান করে না। বিদেশি অতিথিরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, “এই কি বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দর?”
যাত্রীদের দুর্ভোগ:
ভোর কিংবা রাতে ফ্লাইট ধরতে আসা যাত্রীরা বাধ্য হয়েছেন পানি মাড়িয়ে টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশ করতে। অনেকে জুতা খুলে, লাগেজ কাঁধে নিয়ে হাঁটছেন। অসুস্থ, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। নারী যাত্রীরা নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কাও প্রকাশ করেন।
বিদেশফেরত যাত্রীদের কেউ কেউ জানান, এমন দুর্দশার চিত্র দেখে বিস্মিত হয়েছেন তারা। একজন প্রবাসী যাত্রী বলেন, “এই বিমানবন্দর দিয়ে দেশে নামি, অথচ নামার পরই মনে হয় কাদা-পানিতে নেমে পড়লাম।
কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানোর প্রবণতা:
জলাবদ্ধতার এই সমস্যা নতুন নয়। প্রতিবার বর্ষাকালে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হলেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ অল্প সময়ের বৃষ্টিতে পানি জমার জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করলেও, বিশ্লেষকরা বলছেন এটি কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ও দুর্যোগ পরিকল্পনার ঘাটতির ফল।
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষতি:
এই অরাজক চিত্র শুধু দেশি নাগরিকদের নয়, বিদেশি যাত্রীদের কাছেও দেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এটাই কি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মান?”
বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী প্রধান এই প্রবেশপথে এমন বেহাল পরিস্থিতি দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দেয়। পর্যটক, বিনিয়োগকারী ও কূটনীতিকদের দৃষ্টিতে এটি দেশের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং অব্যবস্থাপনার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সুপারিশ:
নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাহজালাল বিমানবন্দরের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি স্থায়ী জলাবদ্ধতা প্রতিরোধ পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এ পরিকল্পনার আওতায় থাকতে হবে—
ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ
বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য পৃথক ভূগর্ভস্থ লাইন
রুটিন ড্রেন পরিষ্কারের পাশাপাশি রিয়েলটাইম পানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা
বিমানবন্দর এলাকায় জরুরি বৃষ্টিপাত প্রতিক্রিয়া ইউনিট (Emergency Response Team)
তারা আরও বলছেন, এই বিমানবন্দর দিয়ে দেশের সম্মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। অথচ সেখানেই যদি এমন অযত্ন-অবহেলা চলে, তা হলে পুরো অবকাঠামোগত দুর্বলতাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্মোচিত হয়। এছাড়া নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম না থাকা, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এই অব্যবস্থার মূল কারণ। তারা বলেন, দেশের সম্মান রক্ষায় বিমানবন্দরের বাইরের পরিবেশও ভেতরের মতো গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
একদিকে দেশের অর্থনীতি, পর্যটন ও বিনিয়োগ প্রবাহে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি মুখ্য ভূমিকা রাখে; অন্যদিকে এর এমন অযত্ন-অব্যবস্থা দেশের উন্নয়নশীল ভাবমূর্তিকে বড় ধাক্কা দেয়। এখন সময় এসেছে কঠোর জবাবদিহি এবং টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার।
মতামত দিন