দালালের ফাঁদে নবজাতক,৯ দিন পর ফিরে পেল মায়ের কোল।
পরিবার থেকে প্রত্যাখ্যাত এক নারীর দুর্দশাকে পুঁজি করে এই শিশুপাচার চক্র তাকে ফাঁদে ফেলে। জানা গেছে, সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় ওই নারী এক প্রবাসীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং গর্ভধারণের পর বাংলাদেশে ফিরে আসেন। কিন্তু দেশে ফেরার পর আগের স্বামী ও সন্তানদের কাছ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন। সামাজিক ও পারিবারিক চাপে সন্তান দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
গত ২১ জুন স্থানীয় একটি ক্লিনিকে সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেন ওই নারী। কিন্তু জন্মের মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই আঞ্জু, সাবিনা, সুজন ও মানিক নামে পরিচিত কয়েকজন দালাল শিশুটিকে ‘দত্তক’ নেওয়ার কথা বলে নিয়ে যান। এরপর থেকে নবজাতকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
সচেতন স্থানীয়দের সহায়তায় ও সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে বিষয়টি জনসমক্ষে এলে চক্রটি চাপের মুখে পড়ে। একপর্যায়ে তারা শিশুটিকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। তবে এর আগে ওই নারীর কাছ থেকে একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায় করে নেয় তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিশুটিকে বগুড়া জেলার এক দম্পতির কাছে বিক্রি করা হয়েছিল, যারা ঢাকায় বসবাস করেন। এই কাজে সরাসরি জড়িত ছিল পাঁচ-ছয় জনের একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র।
মানবাধিকারকর্মী নাহিদ পারভিন রিপা বলেন, ‘‘দারিদ্র্য আর সচেতনতার অভাবকে কাজে লাগিয়ে এসব চক্র শিশু কেনাবেচার মতো ভয়াবহ অপরাধ করে যাচ্ছে। প্রশাসনের নির্লিপ্ততা এবং জনসচেতনতার অভাবেই এমন অপরাধ বারবার ঘটছে।’’
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, চক্রটি শুধু শিশু বিক্রিই নয়, অবৈধ গর্ভপাতের সঙ্গেও যুক্ত। অনুসন্ধান করতে গিয়ে হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন তারা। পীরগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মুজিবুর রহমান ও প্রেস ক্লাবের সদস্য লিমন সরকার জানান, অনুসন্ধান করতে গিয়ে একাধিকবার হুমকি পেয়েছেন। দালাল চক্রের সদস্যরা প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘‘হাত-পা ভেঙে দেওয়া হবে।’’
চক্রের সঙ্গে অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলছেন, তারা শুধু ‘‘সহযোগিতা করেছেন’’। কিন্তু সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং নিজেদের ‘‘বড় হাত’’ থাকার ভয় দেখিয়ে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে তারা।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখনও কেউ লিখিত অভিযোগ না করলেও প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
স্থানীয়দের মতে, এমন ভয়ংকর চক্র ভেঙে দিতে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে সজাগ দৃষ্টি প্রয়োজন, নইলে আরও অনেক মা তার সন্তান হারানোর ভয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হবেন।
মতামত দিন